ইস্রাফিল হোসেন ইমন:
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় লিচু বাগানগুলোতে চোখ রাখলেই ধরা পড়ছে সাদা ও হালকা হলুদ রঙের অসংখ্য মুকুল। বাতাসে ভেসে বেড়ানো লিচু ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। মাঠজুড়ে যেন সবুজের হাতছানি। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি লিচু গাছ, আর গাছের পাতার ফাঁকে দোয়েল, শালিক, চড়ুইসহ বিচিত্র সব পাখির কলতান প্রকৃতিকে করেছে আরও মনোরম। ফাল্গুনের শুরুতেই সবুজ পাতার ফাঁকে নাকফুলের মতো লিচুর মুকুল আসতে শুরু করেছে, এতে প্রকৃতি সেজেছে অপরূপ সাজে। মুকুলের মৌ মৌ গন্ধে মুগ্ধ হয়ে উঠছে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা।
ইতোমধ্যে বাগান চাষিরা গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। কেউ সেচ দিয়েছেন, কেউবা সেচ দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। ভালো ফলনের আশায় বাগান ও বসতবাড়ির লিচু গাছের পরিচর্যা শুরু হয়েছে। সাধারণত মাঘের শেষ সপ্তাহ থেকে ফাল্গুনের মাঝামাঝি সময়ে লিচু গাছে মুকুল আসে। তবে এবার মুকুলের বদলে অনেক গাছে নতুন পাতা বের হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছরের মতো এ সময় লিচু গাছে মুকুল আসে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং ঝড়-বৃষ্টি না হলে এ বছরও ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে কুষ্টিয়া জেলা ও উপজেলার অনেক লিচু গাছ মুকুলে ভরে উঠেছে। মুকুলের মিষ্টি গন্ধে বাগানে মৌমাছির আনাগোনাও বেড়েছে।
চাষিরা বলছেন, নতুন পাতা বের হওয়া গাছে মুকুল আসার সম্ভাবনা কম। ফলে গতবারের তুলনায় লিচুর ফলন কিছুটা কম হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
জানা গেছে, ভেড়ামারায় সাধারণত তিন প্রজাতির লিচুর ফলন হয়ে থাকে। এগুলো হলো—পাতি লিচু, কদমী লিচু ও চায়না থ্রি লিচু। এর মধ্যে পাতি লিচুর চাষই সবচেয়ে বেশি হয়। এছাড়া অনেকেই কদমী লিচুর চাষ করেন। বাংলাদেশের অনেক জেলায় লিচুর বাম্পার ফলন হলেও আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্যের কারণে কুষ্টিয়ায় লিচু আগে পেকে থাকে। ফলে প্রতি বছরের মে মাসের প্রথম দিকেই কুষ্টিয়ার লিচু বাজারে আসে।
সরেজমিনে ভেড়ামারার ছয়টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, বাগানগুলোতে লিচুর মুকুল আসার আগ থেকেই চাষিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। মুকুল আসার পর পরিচর্যার ব্যস্ততা আরও বেড়েছে। বৈরী আবহাওয়া সৃষ্টি না হলে লিচুর ফলন ভালো হবে বলে আশা করছেন তারা। মুকুল যেন ঝরে না পড়ে, সে জন্য বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষকেরা।
বাড়ির আঙিনায় লাগানো গাছের মালিক সামছের আলী জানান, ইতোমধ্যেই তার লাগানো লিচু গাছে মুকুল আসতে শুরু করেছে। তবে দুই-তিনটি গাছে এখনো মুকুল আসেনি, সেখানে নতুন পাতা বের হচ্ছে। তার মতে, গত বছরের তুলনায় এবার ফলন কিছুটা কম হতে পারে।
বাগান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না এলে এবারও বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। লাভজনক হওয়ায় জেলায় প্রতি বছরই লিচু চাষের পরিধি বাড়ছে।
বাগান মালিক আব্দুল মিমন বলেন, তার বাগানে এ বছর চায়না থ্রি ও পাতি জাতের লিচু গাছ মুকুলে ভরে উঠেছে। শখ করে পুকুরপাড়ে কিছু লিচু গাছ লাগিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে মৌসুমে ভালো আয়ও হয়। গাছের মুকুল দেখে এবারও ভালো লাভের আশা করছেন তিনি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গতবারের চেয়ে ভালো ফলন হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন।
লিচু ব্যবসায়ী করিম মন্ডল জানান, গত বছর তিনি প্রায় ৩০ একর লিচু বাগান কিনেছিলেন। বাগানের প্রায় সব গাছে মুকুল এসেছিল এবং ফলনও ভালো হয়েছিল। লিচু বিক্রি করে ভালো লাভ পেয়েছিলেন। তবে এবার গাছগুলো দ্রুত সবুজ ও তামাটে পাতা ছেড়েছে। কিছু ডালে মুকুল থাকলেও পাতার আধিক্য বেশি। তবুও এখনো মুকুল আসার সম্ভাবনা শেষ হয়নি বলে তিনি আশা করছেন।
ভেড়ামারা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মাহামুদা সুলতানা জানান, ভেড়ামারা উপজেলায় আগাম লিচুর বেশ সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, অসময়ে বৃষ্টির কারণে অনেক গাছে মুকুলের বদলে নতুন পাতা বের হয়েছে। এছাড়া লিচু বাগানে সাথী ফসল হিসেবে সবজি চাষ করায় জমিতে সেচ দেওয়া হয়েছে, যার কারণে কিছু গাছে মুকুলের পরিবর্তে নতুন পাতা এসেছে। তবে এ ধরনের ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় লিচুর ফলনে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও জানান, লিচু আবাদকৃত ইউনিয়নগুলোতে মাঠপর্যায়ে কর্মরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছেন।

দেড় লাখ টাকার গাছ ৫০ হাজারে নিলাম 
ইস্রাফিল হোসেন ইমন, ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি 





















