ইসমাইল হােসেন বাবুঃ
লোকসঙ্গীতের কিংবদন্তি শিল্পী ফরিদা পারভীনের মরদেহ কুষ্টিয়ায় এসে পৌছায় আজ রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাত ৮ টা ৪৫ মিনিটের সময়। লোকসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীনের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় কুষ্টিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সরকারি কলেজ মাঠে। পরে তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী জেলার পৌর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। ফরিদা পারভীনের শেষ ঠিকানা হলাে কুষ্টিয়ায় পৌর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে।
বাবা দেলোয়ার হোসেন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হওয়ার সুবাদে কুষ্টিয়ার বাসিন্দা হয়ে ওঠেন ছিলেন ফরিদা পারভীন। শহরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজেই পড়েছেন তিনি। পৌর শহরের পিটিআই রোডে তাঁর পৈতৃক বাড়ি। তাঁর বাবা-মাকে পৌর শহরের কবরস্থানেই দাফন করা হয়। এবার বাবা-মায়ের কবরেই দাফন করা হয় গুনিএই শিল্পীকে।
লালনগীতিতে অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। এর বাইরে ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটির জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী (নারী) হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি ২০০৮ সালে জাপানের ফুকুওয়াকা পুরস্কার লাভ করেন। তার মতো কেউ লালন সঙ্গীত পরিবেশন করতে পারেননি। একুশে পদকসহ অসংখ্য পদক পাওয়া গুণী এই শিল্পীকে ‘লালন সম্রাজ্ঞী’ বলা হয়ে থাকে।
কুষ্টিয়া পৌর গোরস্তানের খাদেম নূর ইসলাম বলেন, তিনি দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে এ গোরস্তানে খাদেমের দায়িত্বে আছেন। ফরিদা পারভীনের পরিবারের সঙ্গে তাঁর সখ্য ছিল। ফরিদার বাবা দেলোয়ার হোসেন ১৯৯৬ সালে মারা যান। তাঁকে দাফনের জন্য কবর খুঁড়েছিলেন। এরপর তাঁর মা রৌফা বেগম মারা যান। তাঁকেও একই কবরে দাফন করেছিলেন। আজ ফরিদার লাশ আসছে। তাঁকেও একই কবরে দাফন করা হলাে।
বাংলার আঞ্চলিক সুর ও লালনের গানকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন ফরিদা পারভীন। ভক্ত-শ্রোতাদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু শিল্পী নন, ছিলেন লালনচর্চার অন্যতম প্রধান মুখ। তার কণ্ঠে ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’, ‘আমি কোথায় পাবো তারে’, ‘তুমি জানো না রে প্রাণহীন দেহে’, ‘নিন্দা আর করিস না বকুল ফুল’এসব গান হয়ে উঠেছিল কালজয়ী।
স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়ার দোলপূর্ণিমার মহাসমাবেশে প্রথমবারের মতো লালনের গান পরিবেশন করেন ফরিদা পারভীন। সেই গান ছিল, ‘সত্য বল সুপথে চল’। শ্রোতার আবেগ, উচ্ছ্বাস আর প্রশংসা তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, এই পথেই তাঁর যাত্রা। শুরুতে অনীহা থাকলেও বাবার উৎসাহে মকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে লালনের গান শেখা শুরু করেন। এরপর খোদা বক্স সাঁই, করিম সাঁই, ব্রজেন দাসসহ গুরুপরম্পরার সাধকদের কাছে তালিম নিয়ে লালনের গানকে তিনি কণ্ঠে ধারণ করেন। তাঁর কণ্ঠে লালনের গান হয়ে ওঠে শুধু সংগীত নয়, এক অনন্য জীবনদর্শন।
১৯৫৪ সালে নাটোরে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদা পারভীন। শৈশবেই সংগীত শিক্ষার হাতেখড়ি। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সংগীতচর্চায় যুক্ত হন। ১৯৭৩ সালে রাজশাহী বেতারে নজরুল সঙ্গীতের মাধ্যমে তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে লালনের গান দিয়েই তিনি সবার হৃদয়ে জায়গা করে নেন।
কণ্ঠশিল্পী হিসেবে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ফরিদা পারভীন পেয়েছেন একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা। তিনি রেখে গেছেন অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী।
কুষ্টিয়া তাঁর শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিভরা জায়গা, যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন মা-বাবা, শিল্পীরও চাওয়া তাঁকে যেন মা–বাবার কবরে সমাহিত করা হয়, এমনটাই মত দিয়েছেন নাহিল ও জিহান। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, ফরিদা পারভীনের শেষ ঠিকানা হবে এবং হলাে কুষ্টিয়া।
ফরিদা পারভীনের ছেলে এম আই নাহিল জানান, তাঁরা মাকে কুষ্টিয়ায় নিয়ে যেতে চান। ঢাকায় কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা করতে চান না। যত দ্রুত মাকে দাফন করা হবে, ততই মঙ্গল। তবে গাজী আবদুল হাকিমের বক্তব্য ছিল এ রকম, ‘শিল্পী ফরিদা পারভীন রাষ্ট্রের সম্পদ। তাই আমার চাওয়া, তাঁকে যেন সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শহীদ মিনারে নেওয়া হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়। ফরিদা পারভীনের হাতে গড়া গানের স্কুল “অচিন পাখি”তে শেষবারের মতো ঘুরিয়ে নেওয়া হয়।
গাজী আবদুল হাকিম ও ফরিদা পারভীনের আগের সংসারের সন্তানদের চাওয়া যখন বিপরীতমুখী, তখন এ নিয়ে অভিভাবক পর্যায়ের কয়েকজন হাসপাতালের ভেতরই আলোচনায় বসেন। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকায় যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা হবে, কিন্তু চিরনিদ্রায় শায়িত হবে কুষ্টিয়ার পৌর কবরস্থানে, যেখানে শিল্পীর বাবা দেলোয়ার হোসাইন ও মা রওফা বেগমকে সমাহিত করা হয়েছে। ছেলে নাহিল বললেন, আমার মায়ের অসিয়ত ছিল, তাঁকে যেন তাঁর বাবা-মায়ের কবরে দাফন করা হয়। এটা তিনি লিখেও দিয়ে গেছেন। ছেলের কথা শুনে একপর্যায়ে মেনে নেন গাজী আবদুল হাকিমও। সন্তানদের চোখে তখন জল, মুখে একধরনের শান্তি,মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের তৃপ্তি। আবদুল হাকিমও যেন সন্তানদের চাওয়া পূরণ করতে পেরে স্বস্তি পেলেন।
প্রিন্ট

ফরিদপুরে ট্রিপল মার্ডারঃ ১০ ঘণ্টায় গ্রেফতার প্রধান আসামি, উদ্ধার কোদাল 
ইসমাইল হােসেন বাবু, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার 





















