আলিফ হোসেন:
দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশই বোরো। এই ধান কাটার মৌসুম মানেই গ্রামবাংলায় উৎসবের আমেজ। তবে এবার উৎসবের বদলে ফসল ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষক।
রাজশাহীর তানোরে আংশিকভাবে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। এই সময়ে কৃষকের সামনে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি ও কৃষিযন্ত্র সংকট। সেচ মৌসুমে জ্বালানি সংকট সামাল না দিতেই এখন ফসল কাটা, মাড়াই ও পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
মাঠ পর্যায়ের কৃষক, কৃষিযন্ত্র মালিক, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়া জ্বালানি নির্ভর। জমিতে সেচ দেওয়া থেকে শুরু করে ধান কাটা, মাড়াই, পরিবহন ও বাজারজাত—সবকিছুতেই ডিজেল অপরিহার্য। ফলে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন খরচ ও ফসল ঘরে তোলার ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়ের মধ্যে ধান ঘরে তুলতে না পারলে শুধু কৃষক নয়, পুরো দেশের খাদ্যব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ফলে কৃষিতে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে ধান কাটার প্রতিটি ধাপেই জ্বালানি অপরিহার্য। ধান কাটা, মাড়াই, জমি থেকে সংগ্রহ, পরিবহন এবং আড়তে পৌঁছানো পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি ধাপে ডিজেল ব্যবহার করতে হয়। শ্রমিক সংকট ও মজুরি বাড়ার কারণে কৃষকরা এখন ক্রমেই যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ছেন। ধান কাটার ক্ষেত্রে কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহার বেড়েছে। এই যন্ত্র দিয়ে একসঙ্গে ধান কাটা, মাড়াই এবং বস্তাবন্দির কাজ করা সম্ভব, তবে এটি পুরোপুরি ডিজেলচালিত। একইভাবে থ্রেশার, বোমা মেশিন, ট্রাক্টর, ট্রলি এবং নৌযান জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তানোরে ডিজেলের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপ্রতুল হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।
তানোরের পাঁচন্দর ইউনিয়নের কৃষক দুরুল হুদা জানান, তিনি এবার তিন একর জমিতে ধান চাষ করেছেন। শ্রমিক সংকট ও উচ্চ মজুরির কারণে যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু ১০৩ টাকার ডিজেল তাঁকে ১৩০ টাকায় কিনতে হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ধান কাটার পুরো সময় যদি এই সংকট থাকে, তাহলে কৃষকরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন।
তানোর পৌর এলাকার কৃষক শাকির জানান, কয়েকদিন ধরে ধান কাটার শ্রমিক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ধানের দাম না থাকায় শ্রমিকরা ধান কাটতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। শ্রমিকরা ধান কাটলেও বহন করতে চায় না। গাড়ি করে বহন করা হয়, কিন্তু তেল না পাওয়ায় গাড়ি বন্ধ। বৈশাখ মাসে যেকোনো সময় ঝড়-বৃষ্টি হলে পাকা ধানের অবস্থা খারাপ হয়ে পড়বে।
অপর কৃষক সাহেব আলী জানান, বিগত বছরগুলোতে ধান কাটার আগেই শ্রমিকরা জমি দেখে যেতো কখন কাটা হবে, কখন আসতে হবে। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ধান পেকে গেছে, কাটার সঠিক সময়, কিন্তু শ্রমিক মিলছে না। আবার তীব্র তাপমাত্রা শুরু হয়েছে। বিলের নিচু জমির প্রায় ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে। এতে শ্রমিকরা কাটতে চায় না, আর কাটলেও দ্বিগুণ খরচ হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার চান্দুড়িয়া ইউপির দমদমা, গাগরন্দ, হাড়দহ, জুড়ানপুরসহ তানোর পৌর এলাকার কৃষকদের বেশির ভাগ বোরো জমি বিলে রয়েছে। কালীগঞ্জ, মাসিন্দা, হাবিবনগর, বুরুজ, ভদ্রখণ্ড, কাশিমবাজার, জিওল, চাঁদপুর, আমশো, মথুরাপুর, সরকারপাড়া, তাতিয়ালপাড়া, গোল্লাপাড়া, হলদারপাড়া, তানোরপাড়া, কুঠিপাড়া, হিন্দুপাড়া, গুবিরপাড়া, সিন্দুকাই, ধানতৈড়, চাপড়া, গোকুল, তালন্দ কলেজপাড়া, বেলপুকুরিয়া, বাহাড়িয়া, সুমাসপুর, হরিদেবপুর, লবিয়তলা ব্রিজের পশ্চিমে, উত্তরে, পূর্বে ও দক্ষিণে কামারগাঁ ইউপির হাতিশাইল, বারোঘরিয়া, হাতিনান্দা, কামারগাঁ, কচুয়া, দমদমা, মজুমদারপাড়া, শ্রীখণ্ডা, কৃষ্ণপুর, বাতাসপুর, পারিশো, দুর্গাপুর, মাড়িয়া, মাদারিপুর, ভবানীপুর, জমসেদপুর, বিহারইল, মালশিরা, ধানোরা, চককাজিজিয়া, কলমা ইউপির কুজিশহর, চন্দবকোঠাসহ এসব গ্রামের নিচে বিলকুমারী বিলের জমির অবস্থান। প্রায় সব জমির ধান পেকে গেছে। বিলের উঁচু এলাকার জমির ধান খাড়া আছে, আর নিচু এলাকার ধান মাটিতে নুয়ে পড়েছে।
তালন্দ এলাকার কৃষক সামিনুল, আরশাদসহ অনেকে জানান, ধানের চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সারের সংকট, জ্বালানির সংকট, দামে ধস—সব মিলিয়ে শ্রমিক সংকটে ধান কাটা যাচ্ছে না। এক মণ (৩৮ কেজি) ধানের দাম ১১০০ থেকে ১১২০ টাকা, কিন্তু একজন শ্রমিকের মজুরি দিতে হচ্ছে ৮০০ টাকা। এবার এক বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে ধানের ফলন হয়েছে ১৬ থেকে ২০ মণ।
সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েছেন বিলপাড়ে চাষাবাদ করা কৃষকেরা। কারণ বিলপাড়ের পুরো মাঠের বোরো ধান পেকে গেছে। এক সপ্তাহের মধ্যে এসব ধান কাটতে না পারলে তারা বড় সমস্যায় পড়বেন। অথচ ধান কাটার শ্রমিক পাচ্ছেন না।
তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ জানান, উপজেলার চান্দুড়িয়া থেকে কামারগাঁ ইউপির চৌবাড়িয়া মালশিরা পর্যন্ত বিলের জমি। এসব জমিতে আগাম বোরো চাষ হয়। প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর বিলের জমিতে বোরো চাষ হয়েছে এবং অধিকাংশ জমির ধান পেকে গেছে। এবারে উপজেলায় মোট ১৪ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যেভাবেই হোক দ্রুত সময়ের মধ্যে ধান কাটতে হবে। কারণ বৈশাখ মাস—যেকোনো সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করে তুলতে পারে।
প্রিন্ট

ফরিদপুরে ট্রিপল মার্ডারঃ ১০ ঘণ্টায় গ্রেফতার প্রধান আসামি, উদ্ধার কোদাল 
আলিফ হোসেন, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি 


















