মোঃ নাঈমুল ইসলামঃ
১৬ জুলাই, ২০২৪। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল সারাদেশ। রংপুরের রাজপথ সেদিন প্রকম্পিত ছিল শিক্ষার্থীদের স্লোগানে। সেই আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মাহবুর আল হাসান মুন। কিন্তু সেই দিনের একটি ঘটনাই বদলে দিয়েছে মুনের জীবন। বর্তমানে তিনি চলন্ত এক ‘বুলেটের আধার’। শরীরে প্রায় দেড়শটি বুলেট নিয়ে প্রতিদিন যন্ত্রণার সাথে লড়াই করছেন এই জুলাই যোদ্ধা।
দুপুর ১টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গেটে পৌঁছান মুন। সেখানে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ ও পরে এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে। সামনের সারিতে থাকা মুনের শরীরে বিঁধে যায় প্রায় ২০০টি বুলেট। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সহপাঠীরা তাকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।
হাসপাতালে ভর্তির পর চিকিৎসকরা শরীর থেকে ৪০টি বুলেট বের করতে সক্ষম হলেও এখনো মুনের শরীরে রয়ে গেছে প্রায় ১৫০টি বুলেট। এর মধ্যে ৫টি মাথায় এবং ১০টি মুখে অবস্থান করছে। বাকিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শরীরের বিভিন্ন অংশে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এই জটিল অস্ত্রোপচার দেশে সম্ভব নয়; তাকে দ্রুত বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠাতে হবে।
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার পানিয়াল পুকুর গ্রামের কৃষক আব্দুল খালেকের ছোট ছেলে মুন। ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল দরিদ্র এই পরিবারের। কিন্তু এখন সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসছে। মুনের বাবা বলেন, “আমি গরিব মানুষ, ছেলেকে পড়ানোই যেখানে কষ্টের, সেখানে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানো আমার কাছে স্বপ্নের মতো। সরকার যদি আমার ছেলেকে একটু সাহায্য করে, তবেই ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।”
মুনের গেজেট নাম্বার ৯৮৭ এবং জুলাই যোদ্ধা কার্ডের কেস আইডি ৩২৯০৪। সরকারিভাবে তিনি জুলাই যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও এখনো উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাননি। মুন বলেন, “দেড় বছর ধরে (আন্দোলন পরবর্তী সময়কাল) প্রচণ্ড মাথাব্যথা আর শরীর ব্যথায় আমি রাতে ঘুমাতে পারি না। পড়াশোনায় মন দিতে পারছি না। সরকার বিদেশে পাঠানোর কথা বললেও এখনো কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ দেখিনি।”
মা মুন্নি বেগম অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, “মা হিসেবে ছেলের এই কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। আমি শুধু চাই আমার ছেলেটা আবার সুস্থ হয়ে হাসিমুখে ফিরে আসুক।”
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিমা আঞ্জুম সোহানিয়া বলেন, “উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সরকারিভাবে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা করার চেষ্টা করা হবে।”
শরীরে বিঁধে থাকা প্রতিটি বুলেট যেন এক একটি জীবন্ত যন্ত্রণার গল্প বলছে। এখন প্রশ্ন একটাই—কবে শেষ হবে এই জুলাই যোদ্ধার দীর্ঘ প্রতীক্ষা? কবে রাষ্ট্র তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে এই মরণব্যাধি যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবে?
প্রিন্ট

ফরিদপুরে ট্রিপল মার্ডারঃ ১০ ঘণ্টায় গ্রেফতার প্রধান আসামি, উদ্ধার কোদাল 
মোঃ নাঈমুল ইসলাম, রংপুর (সদর) উপজেলা প্রতিনিধি 


















