ঢাকা , শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo ফরিদপুরে ট্রিপল মার্ডারঃ ১০ ঘণ্টায় গ্রেফতার প্রধান আসামি, উদ্ধার কোদাল Logo ফরিদপুরে ‘শ্মশান বন্ধু’ কানু সেন অনেকটাই সুস্থ Logo বাঘায় সুষ্ঠ সুন্দর পরিবেশে প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিতঃ উপস্থিতির হারে বালিকা এগিয়ে Logo নরসিংদীর শিবপুরে ২৬ মামলার আসামিসহ দুই ডাকাত গ্রেপ্তার Logo খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ইস্টার সানডে পালিত হবে আগামীকাল Logo কুষ্টিয়া সীমান্তে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মাদক উদ্ধার Logo সকল রাজনৈক দল, ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণী পেশার মানুষের সেবা করতে বিএনপি সরকার ওয়াদাবদ্ধ Logo সেনবাগে কাওমী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসায় ঈদ উপহার বিতরণ করলেন লায়ন শাহাদাত হোসেন Logo সিংড়ায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ১০ Logo কুষ্টিয়ায় মাদক সেবনের টাকা না পেয়ে বসতঘরে আগুন
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

ভাতের পাতিলে দগ্ধ ঘরকন্নার স্বপ্নঃ পীরগঞ্জে মানবিকতার চরম অবক্ষয়

জসীমউদ্দীন ইতিঃ

 

সকাল থেকে দুপুর—গ্রামের নিস্তরঙ্গ জীবনে নারীদের ব্যস্ততা কাটে রান্নাঘরে। চাল ধোয়া, চুলা জ্বালানো আর পরিবারের সবার অন্ন জোগাড়ের চিরায়ত সেই দৃশ্য। কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার ১০ নম্বর শান্ত হাজীপুর ইউনিয়নের পাটুয়াপাড়া গ্রামে গত সপ্তাহের মঙ্গলবার দুপুরে যা ঘটল, তা কোনো স্বাভাবিক চিত্র নয়; বরং তা ছিল এক বীভৎস পৈশাচিকতা। যে উনুনে দুমুঠো ভাতের স্বপ্ন ফুটেছিল, সেই ফুটন্ত ভাতের পাতিলেই ঝলসে গেল এক গৃহবধূর স্বপ্ন, সংসার আর বেঁচে থাকার স্বাভাবিক অধিকার।

 

ভিকটিম নার্গিস আক্তার যখন দুপুরের রান্নায় ব্যস্ত ছিলেন, তখন হয়তো ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি যে তার অতি পরিচিত রান্নাঘরটিই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। পারিবারিক তুচ্ছ কলহ—যা প্রতিটি সংসারেই কমবেশি থাকে—তা যে এমন নারকীয় রূপ নিতে পারে, তা ভাবলে আজও শিউরে উঠছে এলাকাবাসী। ইউসুফ আলীর ছেলে সালমান শাহর যে হাত দিয়ে স্ত্রীকে আগলে রাখার কথা ছিল, সেই হাত দিয়েই তিনি পিছন থেকে অতর্কিতে নার্গিসের মাথা চেপে ধরলেন টগবগে ফুটন্ত ভাতের পাতিলে।

 

মুখমণ্ডলের তিন-চতুর্থাংশ দগ্ধ হয়ে যখন নার্গিস যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, তখন সেই আর্তনাদ কি পৌঁছায়নি পাষণ্ড স্বামীর কানে? নাকি বিকৃত আক্রোশ তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল? আজ দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সাদা বিছানায় শুয়ে নার্গিস কেবল নিজের পোড়া চামড়ার জ্বালা সইছেন না, বরং সইছেন একটি সাজানো সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার নীল বেদনা।

 

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, এই দম্পতির একটি সন্তান রয়েছে। যে শিশুটি হয়তো জানতও না তার বাবার ভেতরে এমন এক দানব লুকিয়ে আছে। মায়ের এই বীভৎস দশা আর বাবার এই অপরাধী পরিচয় ওই শিশুটির মনে আজীবন কী প্রভাব ফেলবে, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।

 

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন খোদ সালমানের বাবা ইউসুফ আলী ও মা হালিমা খাতুন। এটি যেমন একদিকে সত্যের প্রকাশ, অন্যদিকে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর এক চরম ব্যর্থতা। ঘরের ভেতরে যখন একজন নারী নিরাপদ নন, যখন তার আপনজনই তার ঘাতক হয়ে ওঠে, তখন আমরা সমাজ হিসেবে ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি?

এই ঘটনা কেবল পীরগঞ্জের নয়, এটি সারা দেশের নারীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন। প্রায়ই দেখা যায়, পারিবারিক কলহের দোহাই দিয়ে এই ধরনের অপরাধকে লঘু করে দেখার চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে আপস-মীমাংসার নামে অপরাধীকে আড়াল করা হয়। কিন্তু নার্গিসের এই দগ্ধ মুখমণ্ডল কি কেবল আপসে সেরে যাবে?

 

আমরা সাংবাদিকরা যখন এমন সংবাদ পরিবেশন করি, তখন আমাদের লক্ষ্য থাকে কেবল তথ্য দেওয়া নয়, বরং বিচার নিশ্চিত করা। সালমান শাহর মতো অপরাধীদের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা না হয়, তবে ঘরে ঘরে আরও অনেক ‘সালমান’ তৈরি হবে। পীরগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে এলাকাবাসীর জোরালো দাবি—অবিলম্বে এই পাষণ্ডকে গ্রেপ্তার করে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

 

চাই ন্যায়বিচার ও সামাজিক সচেতনতাঃ নার্গিস আক্তার হয়তো হাসপাতালের চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরবেন, কিন্তু তার এই ক্ষত তাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। আয়নায় নিজের পোড়া মুখ দেখলে তিনি কি ভুলতে পারবেন সেই মঙ্গলবারের বিভীষিকা? আমরা চাই না আর কোনো নারীর ঘরকন্নার স্বপ্ন এভাবে আগুনের লেলিহান শিখায় কিংবা ভাতের পাতিলে ঝলসে যাক।

 

ঠাকুরগাঁওয়ের শান্ত হাজীপুর ইউনিয়নের এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কেবল আইন নয়, প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং পাড়ায়-মহল্লায় জোরালো সামাজিক প্রতিরোধ। প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই মামলার নিষ্পত্তি হওয়া এখন সময়ের দাবি।


প্রিন্ট
Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

ভোলাহাটে ২১শে পদকপ্রাপ্ত জিয়াউল হকের জীবন কাহিনী

error: Content is protected !!

ভাতের পাতিলে দগ্ধ ঘরকন্নার স্বপ্নঃ পীরগঞ্জে মানবিকতার চরম অবক্ষয়

আপডেট টাইম : ০৫:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
জসীমউদ্দীন ইতি, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি :

জসীমউদ্দীন ইতিঃ

 

সকাল থেকে দুপুর—গ্রামের নিস্তরঙ্গ জীবনে নারীদের ব্যস্ততা কাটে রান্নাঘরে। চাল ধোয়া, চুলা জ্বালানো আর পরিবারের সবার অন্ন জোগাড়ের চিরায়ত সেই দৃশ্য। কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার ১০ নম্বর শান্ত হাজীপুর ইউনিয়নের পাটুয়াপাড়া গ্রামে গত সপ্তাহের মঙ্গলবার দুপুরে যা ঘটল, তা কোনো স্বাভাবিক চিত্র নয়; বরং তা ছিল এক বীভৎস পৈশাচিকতা। যে উনুনে দুমুঠো ভাতের স্বপ্ন ফুটেছিল, সেই ফুটন্ত ভাতের পাতিলেই ঝলসে গেল এক গৃহবধূর স্বপ্ন, সংসার আর বেঁচে থাকার স্বাভাবিক অধিকার।

 

ভিকটিম নার্গিস আক্তার যখন দুপুরের রান্নায় ব্যস্ত ছিলেন, তখন হয়তো ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি যে তার অতি পরিচিত রান্নাঘরটিই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। পারিবারিক তুচ্ছ কলহ—যা প্রতিটি সংসারেই কমবেশি থাকে—তা যে এমন নারকীয় রূপ নিতে পারে, তা ভাবলে আজও শিউরে উঠছে এলাকাবাসী। ইউসুফ আলীর ছেলে সালমান শাহর যে হাত দিয়ে স্ত্রীকে আগলে রাখার কথা ছিল, সেই হাত দিয়েই তিনি পিছন থেকে অতর্কিতে নার্গিসের মাথা চেপে ধরলেন টগবগে ফুটন্ত ভাতের পাতিলে।

 

মুখমণ্ডলের তিন-চতুর্থাংশ দগ্ধ হয়ে যখন নার্গিস যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, তখন সেই আর্তনাদ কি পৌঁছায়নি পাষণ্ড স্বামীর কানে? নাকি বিকৃত আক্রোশ তাকে অন্ধ করে দিয়েছিল? আজ দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সাদা বিছানায় শুয়ে নার্গিস কেবল নিজের পোড়া চামড়ার জ্বালা সইছেন না, বরং সইছেন একটি সাজানো সংসার ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার নীল বেদনা।

 

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, এই দম্পতির একটি সন্তান রয়েছে। যে শিশুটি হয়তো জানতও না তার বাবার ভেতরে এমন এক দানব লুকিয়ে আছে। মায়ের এই বীভৎস দশা আর বাবার এই অপরাধী পরিচয় ওই শিশুটির মনে আজীবন কী প্রভাব ফেলবে, তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।

 

ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন খোদ সালমানের বাবা ইউসুফ আলী ও মা হালিমা খাতুন। এটি যেমন একদিকে সত্যের প্রকাশ, অন্যদিকে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর এক চরম ব্যর্থতা। ঘরের ভেতরে যখন একজন নারী নিরাপদ নন, যখন তার আপনজনই তার ঘাতক হয়ে ওঠে, তখন আমরা সমাজ হিসেবে ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি?

এই ঘটনা কেবল পীরগঞ্জের নয়, এটি সারা দেশের নারীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন। প্রায়ই দেখা যায়, পারিবারিক কলহের দোহাই দিয়ে এই ধরনের অপরাধকে লঘু করে দেখার চেষ্টা করা হয়। অনেক সময় স্থানীয় পর্যায়ে আপস-মীমাংসার নামে অপরাধীকে আড়াল করা হয়। কিন্তু নার্গিসের এই দগ্ধ মুখমণ্ডল কি কেবল আপসে সেরে যাবে?

 

আমরা সাংবাদিকরা যখন এমন সংবাদ পরিবেশন করি, তখন আমাদের লক্ষ্য থাকে কেবল তথ্য দেওয়া নয়, বরং বিচার নিশ্চিত করা। সালমান শাহর মতো অপরাধীদের যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা না হয়, তবে ঘরে ঘরে আরও অনেক ‘সালমান’ তৈরি হবে। পীরগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে এলাকাবাসীর জোরালো দাবি—অবিলম্বে এই পাষণ্ডকে গ্রেপ্তার করে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

 

চাই ন্যায়বিচার ও সামাজিক সচেতনতাঃ নার্গিস আক্তার হয়তো হাসপাতালের চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরবেন, কিন্তু তার এই ক্ষত তাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। আয়নায় নিজের পোড়া মুখ দেখলে তিনি কি ভুলতে পারবেন সেই মঙ্গলবারের বিভীষিকা? আমরা চাই না আর কোনো নারীর ঘরকন্নার স্বপ্ন এভাবে আগুনের লেলিহান শিখায় কিংবা ভাতের পাতিলে ঝলসে যাক।

 

ঠাকুরগাঁওয়ের শান্ত হাজীপুর ইউনিয়নের এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কেবল আইন নয়, প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং পাড়ায়-মহল্লায় জোরালো সামাজিক প্রতিরোধ। প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই মামলার নিষ্পত্তি হওয়া এখন সময়ের দাবি।


প্রিন্ট