গোলাম রাব্বী:
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুরে তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত দ্বিতীয় সড়ক সেতুর পশ্চিম তীরে সেতু রক্ষা বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার এলাকা ধসে পড়েছে। এতে বাঁধে প্রায় ৭০ ফুট গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে স্রোতের ক্ষিপ্ত শব্দে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে লালমনিরহাট–রংপুর সড়কসহ পার্শ্ববর্তী হাজারের বেশি পরিবারের বসতবাড়ি।
পরিস্থিতি সরেজমিনে
বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) দেখা গেছে, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টিপাতের পানি দ্রুত বাড়ছে তিস্তার বুকে। এতে প্রায় ৯০০ মিটার দীর্ঘ সেতু রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন অংশে তীব্র স্রোতের ধাক্কায় মাটি ধুয়ে গিয়ে ব্লকগুলো ধসে পড়ছে। বর্তমানে বাকি ব্লকগুলোও ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা
দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পুরো বাঁধ ভেঙে গিয়ে সেতু ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মহিপুরের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন— “গত দুই বারের বন্যায় বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও রক্ষণাবেক্ষণ কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এবার নদীতে পানি আসা মাত্রই বাঁধের ৬০ মিটার জায়গা ধসে গিয়ে বিশাল গর্ত হয়েছে। এতে তিন গ্রামের প্রায় এক হাজারের বেশি পরিবার ও সেতুটি ক্ষতির মুখে পড়েছে। আমরা এখনো পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো উদ্যোগ দেখিনি। সবকিছু বিলীন হওয়ার পর তারা পরিদর্শনে আসে।”
আরেক বাসিন্দা আনসার আলী বলেন— “নদীর পানি বাড়া-কমাতে ভাঙন শুরু হয়েছে। সেতু রক্ষা বাঁধ ভাঙছে। এলাকার জমিগুলোও ভেঙে গেছে। কত দিন ধরে শুনে আসছি তিস্তা প্রজেক্ট হবে, কিন্তু হয় তো আর না।”
সেতু নির্মাণ ইতিহাস
২০১৮ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) প্রায় ১২১ কোটি টাকা ব্যয়ে গঙ্গাচড়ার মহিপুরে তিস্তার ওপর দ্বিতীয় সড়ক সেতুটি নির্মাণ করে। সেতুটি রংপুর–লালমনিরহাট জেলার মধ্যে যোগাযোগ সহজ করেছে। কিন্তু বর্তমান ভাঙন নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে সেতু ও সংলগ্ন সড়ক মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
জনপ্রতিনিধিদের মতামত
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন— “এর আগে দুইবার বন্যায় বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমরা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম, কিন্তু তারা পদক্ষেপ নেয়নি। এবারও তীব্র স্রোতে বাঁধে আঘাত লাগছে। উজানে আরও বৃষ্টি হলে বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। তখন পানি সরাসরি লালমনিরহাট–রংপুর সড়কে আঘাত করবে, যা ভেঙে গেলে ৩০ লাখ মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হবে। পাশাপাশি তিনটি গ্রামের অন্তত দেড় হাজার পরিবার ক্ষতির সম্মুখীন হবে।”
বন্যা পরিস্থিতি
তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার তিস্তার তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল, চর ও দ্বীপ চরের কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধির কারণে বন্যার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের পশ্চিম ইচলী গ্রামের কুমোবালা বলেন— “সকাল থেকে বাড়িতে পানি উঠতে শুরু করে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছি। এর আগে পানি উঠে দুই দিন কষ্টে থাকলেও কোনো সহায়তা পাইনি।”
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা
গঙ্গাচড়ার নোহালী, আলমবিদিতর, কোলকোন্দ, লক্ষ্মীটারী, গজঘন্টা ও মর্ণেয়া ইউনিয়ন, কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ও টেপামধুপুর ইউনিয়ন, পীরগাছা উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল, চর ও দ্বীপচরে পানি প্রবেশ করেছে। বন্যার আশঙ্কায় অনেকে ঘরবাড়ি নিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।
কোলকোন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্যানেল চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম বলেন— “বিনবিনা, শখের বাজার, খলাইর চর, মটুকপুর, আবুলিয়া, চিলাখাল এলাকায় পানি ঢুকে পড়ায় এসব এলাকার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা জামাল মিয়া বলেন— “রাতে নদীর পানি ছিল না। সকাল থেকে পানি বাড়তে শুরু করে। দুপুরের মধ্যেই ঘরে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। গরু-বাছুর নিয়ে খুব বিপদে আছি। সব জায়গা ডুবে গেছে, কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই।”
প্রশাসনের বক্তব্য
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন— “বন্যায় তিস্তার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রিন্ট

ফরিদপুরে ট্রিপল মার্ডারঃ ১০ ঘণ্টায় গ্রেফতার প্রধান আসামি, উদ্ধার কোদাল 
গোলাম রাব্বী, গংগাচড়া (রংপুর) প্রতিনিধি 





















