রাশিদুল ইসলাম রাশেদ, লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি:
নাটোরের লালপুরে ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাইয়ের আশ্রমে দুই দিনব্যাপী ৩২৭ তম নবান্ন উৎসব উদযাপিত হয়েছে। বুধবার (৪ ডিসেম্বর) সকালে উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর আশ্রম প্রাঙ্গণে বাসী নবান্ন উৎসবে প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে উৎসবটি শেষ হয়।
মঙ্গলবার সকালে গীতা পাঠ ও পূজা অর্চনার মাধ্যমে নবান্ন উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। আশ্রম কমিটির সভাপতি শ্রী সঞ্জয় কুমার কর্মকারের সভাপতিত্বে প্রথম দিন সুধী সমাবেশে ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাইয়ের আবির্ভাব ও তার জীবনচরিত্রের ওপর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান। এছাড়া আরো উপস্থিত ছিলেন লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুজ্জামান, সেনাবাহিনী কর্মকর্তা মাহমুদ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন কমিটির নাটোর জেলা সভাপতি প্রসাদ কুমার।
নবান্ন উপলক্ষে আশ্রম প্রাঙ্গণে ভক্তদের মাঝে প্রসাদ, কলার পাতায় খিচুড়ি, পাঁচ তরকারি ও পায়েস বিতরণ করা হয়। নিঃসন্তান ও বন্ধ্যা নারীরা সদ্য স্নান শেষে ভেজা কাপড়ে আশ্রমের অক্ষয় তলায় বটগাছের নিচে বসে আঁচল বিছিয়ে সন্তান লাভের জন্য প্রার্থনা করেন। কথিত আছে, যদি বটগাছের ফল বা পাতা আঁচলের উপর পড়ে, তাহলে নিঃসন্তান নারী সন্তান লাভ করবে।
আশ্রমের ৪৮তম প্রধান সেবাইত শ্রী পরমানন্দ সাধু বলেন, দুড়দুড়িয়ার নওপাড়া (রামকৃষ্ণপুর) গ্রামে বাংলা ১১০৪ সালে একটি বটগাছের নিচে আস্তানা গাঁড়েন ফকির চাঁদ বৈষ্ণব। তিনি এখানে ধ্যান-তপস্যা ও বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার শুরু করেন। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে দোল পূর্ণিমা, জ্যৈষ্ঠ মাসে গঙ্গা স্নান ও অগ্রহায়ণ মাসে নবান্ন উৎসব উপলক্ষে দেশ-বিদেশের হাজারো ভক্ত সাধক সমবেত হন।
বাংলা ১২৭৪ সনে সাধু ফকির চাঁদ বৈষ্ণব অদৃশ্য হওয়ার পর (বাংলাদেশের প্রথম গোঁসাই সমাধি) আশ্রমটি কালের সাক্ষী হিসেবে গোঁসাইয়ের স্মৃতি বহন করছে। প্রায় ৪৫ ফুট উচ্চতার নিপুণ নকশা খচিত প্রধান ফটকে লেখা আছে ‘স্থাপিত ১১০৪ বাংলা’, অর্থাৎ আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এটি নির্মিত। এখানে ৩২ বিঘা জায়গা জুড়ে রয়েছে ফলজ বৃক্ষ, পূজনীয় ফুলের গাছ ও শানবাঁধানো তিনটি সুবিশাল পুকুর।
আশ্রমের প্রবেশ পথে রয়েছে ময়ূর, বাঘ ও বিভিন্ন প্রাণীর মূর্তি এবং লতা-পাতা কারুকার্য খচিত সুবিশাল ফটক। দ্বিতল এই প্রবেশ পথের ওপর তলাটি সাধারণত ব্যবহৃত হতো অতিথিশালা হিসেবে। কারুকার্য খচিত প্রবেশ পথের বাম পাশে রয়েছে বিশাল দিঘি। আখড়া প্রাঙ্গণে খালি পায়ে প্রবেশ করতে হয়। শ্রী ফকির চাঁদ বৈষ্ণবের বর্গাকৃতির ৪০ ফুট সমাধি সৌধে রয়েছে আরেকটি গৃহ। এর একটি দরজা ছাড়া কোন জানালা পর্যন্ত নেই। মূল মন্দিরে শুধুমাত্র প্রধান সেবাইত প্রবেশ করেন। কথিত আছে, মন্দিরের মধ্যে সাধু ফকির চাঁদ স্বশরীরে প্রবেশ করে ঐশ্বরিকভাবে স্বর্গ লাভ করেন। তাঁর পরিধেয় বস্ত্রাদি সংরক্ষণ করে সমাধি স্তম্ভ নির্মিত হয়েছে।
আশ্রমের মধ্যে রয়েছে বিশাল আকৃতির এক কুয়া। যার একটি সিঁড়ি পথ পাশের রান্নাঘরের সাথে সংযুক্ত রয়েছে। এই সিঁড়ি পথে সাধুরা রান্নাসহ পানীয় জল সংগ্রহ করতেন। বর্তমানে কুয়ার পানি ব্যবহারের অযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। তার পাশেই রয়েছে ভক্তদের জন্য আরেকটি কুয়া। এর পাশে বড় বড় মাটির চুলায় রান্না হয় ভক্তদের প্রসাদ।
আরও পড়ুনঃ লালপুরে গৃহবধুকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে সড়ক অবরোধ করে থানায় বিক্ষোভ
পরিচালনা কমিটির সভাপতি শ্রী সঞ্জয় কুমার কর্মকার বলেন, এই প্রাঙ্গনে ৩২ বিঘা ছাড়াও নওপাড়া, রাজশাহীর বাঘা উপজেলার সুলতানপুর এবং নওগাঁর আত্রাইয়ে আশ্রমের জমি রয়েছে।