ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ১০ টি ইউনিয়নে আগামী ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ভোট। এসব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীদের প্রচার–প্রচারণা শেষ। এখন কেবল ভোট আর জয়-পরাজয়ের অপেক্ষা।

তবে উপজেলার ১০টির নয়টিতেই আওয়ামী লীগের শক্ত ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী থাকায় আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের অবস্থান বেশ নাজুক। ভোট ভাগ হয়ে যাওয়া, নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রুপিংসহ বেশ কয়েকটি কারণে বিপাকে পড়েছে আওয়ামী লীগ।

স্থানীয় ও উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের দ্বিমুখী ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে। নেতাদের দিনে এক চিত্র রাতে আরেক চিত্রর কারনে নৌকার তুলনায় বিদ্রোহী ও বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অবস্থান অপেক্ষাকৃত বেশ পোক্ত।সব মিলিয়ে বিদ্রোহীদের ভারে নৌকার অবস্থা ডুবুডুবু। নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের ভরাডুবির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান চেয়ারম্যান সহ বিএনপির ১৪ জন নেতা স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচন করছেন। অপরদিকে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত আওয়ামী লীগের ১৬ জন বিদ্রোহী প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।

বোয়ালমারী সদর ইউনিয়নে প্রার্থী হয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক নির্বাহী সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম হামিদুল বারী ওরফে বরুন মিয়া। ইউনিয়নে তার অবস্থান বেশ শক্ত।

উপজেলার সদর ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আ. ওহাব মোল্যা তারার বিপরীতে বোয়ালমারী ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আব্দুল হক শেখ বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। আব্দুল হক এলাকায় বেশ জনপ্রিয়। এই ইউনিয়নে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে আব্দুল হক এবং বরুন মিয়ার মধ্যে।

গুনবহা ইউপিতে প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. সিরাজুল ইসলাম। এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা কৃষ লীগের যুগ্ম আহবায়ক কামরুল ইসলাম।

ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পদ থেকে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া মো. আমিনুল ইসলাম বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। এই ইউনিয়নেও বিএনপি নেতা সিরাজুল ইসলামের সাথে বিদ্রোহী প্রার্থী আমিনুল ইসলামের মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতার আভাস পাওয়া গেছে।

দাদপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ সাজ্জাদুর রহমান হাইয়ের বিপরীতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য পদ থেকে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া শামীম মোল্যা, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক থেকে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া মোশাররফ হোসেন ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি থেকে সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত হারুন-অর-রশীদ বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন।

এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুই বিদ্রোহী প্রার্থী শামীম মোল্যা ও মো. মোশাররফ হোসেনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে বলে স্থানীয়দের অভিমত।

চতুল ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. কামরুল ইসলাম উজ্জল। আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা মার্কার প্রার্থী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খন্দকার মো. আবুল বাশারের অবস্থান বেশ নাজুক। উপজেলা যুবলীগের আহবায়ক পদ থেকে সদ্য বহিস্কৃত বিদ্রোহী প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলাম এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আলিমুজ্জামান বাবলু শরিফের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডির লড়াই হবে বলে ইউনিয়নবাসীর ভাষ্য।

ঘোষপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পাওয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক মো. ফারুক হোসেনের বিপরীতে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদ্য অব্যাহতি পাওয়া সদস্য মো. ইমরান হোসেন নবাব বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। এখানেও ফারুক হোসেনের অবস্থান বেশ পোক্ত বলে জানান স্থানীয়রা।

শেখরে উপজেলা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক চেয়ারম্যান মো. রইসুল ইসলাম পলাশ ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র সহ-সভাপতি পদ থেকে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া বিদ্রোহী প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীতা হবে। এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পাওয়া কামাল আহমেদের অবস্থান অপেক্ষাকৃত দুর্বল বলে স্থানীয় ভোটারদের ধারণা।

ময়নায় উপজেলা বিএনপির নির্বাহী সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান মো. মশিউল আজম মৃধার অবস্থান বেশ মজবুত। পক্ষান্তরে নৌকার মনোনয়ন পাওয়া জেলা মৎস্যজীবী লীগের সদস্য পলাশ বিশ্বাসকে পরাজিত করতে আওয়ামী লীগের মধ্যে গ্রুপিং সহ নানা ধরনের গুঞ্জন শুরু হয়েছে।

পরমেশ্বরদী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক মো. সোলাইমান মোল্যা। উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া বিদ্রোহী প্রার্থী মান্নান মাতুব্বরের অবস্থান এখানে বেশ জোরালো। স্থানীয়দের ধারণা, এই ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী মান্নান মাতুব্বর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ নজরুল ইসলামের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

রূপাপাত ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ সভাপতি মহব্বত আলী। উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পদ থেকে সদ্য অব্যাহতি পাওয়া বিদ্রোহী প্রার্থী হেমায়েত হোসেন ও অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী রুপাপাত ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদকের ছেলে মিজানুর রহমান সোনা মিয়ার মধ্যে এখানে প্রতিদ্বন্দ্বীতা আভাস পাওয়া গেছে।

একমাত্র সাতৈর ইউপিতে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মুজিবর রহমানের অবস্থান মুটামুটি। এই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খন্দকার নাজিরুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী রাফিউল আলম মিন্টুর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ইউনিয়নবাসীর অভিমত।

এ ব্যাপারে ময়না ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী পলাশ বিশ্বাস বলেন, আমি শেখ হাসিনার প্রার্থী, আমি কাউকে পরোয়া করি না। কে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াল, কে দাঁড়াল না, তা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। আমি আমার মতো কাজ করে যাচ্ছি।

এ বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহজাহান মীরদাহ জানান, বিদ্রোহী সদস্যদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু সকলে তা আমলে নেননি। বিদ্রোহী প্রার্থীদের দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করতে মিটিং, মিছিল, পথসভা, জনসভাসহ সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্র জানায়, চতুর্থ ধাপে বোয়ালমারী উপজেলার ১০টি ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ৫৬, সাধারণ সদস্য পদে ৩৫১ ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ১১৭ জন।

উপজেলার ১০ ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৮১ জন। এরমধ্যে ঘোষপুর ইউনিয়নের ভোটার সংখ্যা ১৭ হাজার ১৪ জন, সাতৈর ইউনিয়নে ২১ হাজার ৪৬ জন, দাদপুর ইউনিয়নে ১৮ হাজার ৯৮ জন, ময়না ইউনিয়নে ২০ হাজার ৪৯৩ জন, বোয়ালমারী সদর ইউনিয়নে ৭ হাজার ৩৯৩ জন, গুনবহা ইউনিয়নে ১৭ হাজার ১৪৫ জন, চতুল ইউনিয়নে ১৬ হাজার ১৮০ জন, পরমেশ্বরদী ইউনিয়নে ১৫ হাজার ৪২১ জন, রূপাপাত ইউনিয়নে ১৬ হাজার ৫৯৩ জন এবং শেখর ইউনিয়নে ১৯ হাজার ৯৯৮ জন।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ২৩ এপ্রিল তারিখের নির্বাচনে এ উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে পাঁচটিতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী, তিনটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও দু’টি ইউনিয়নে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন।