বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি:

বাঘা-আড়ানী সড়ক সংলগ্ন তালাবদ্ধ ঘর বাইরে থেকে বোঝার উপায় নাই ঘরের ভেতরে নকল-ভেজাল পণ্য তৈরি হয়। একটি মামলার সূত্রে ধরে অনুসন্ধানে প্রকাশ্যে আসে নকল-ভেজাল হারবাল ওষুধ তৈরির কারখানা।

দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাজ্য, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, কোরিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নামি-দামি প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড নকল করে ভেজাল ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরি হতো রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের বাঘা ফায়ার সার্ভিসের পাশে বাঘা-আড়ানী সড়কের পাশে চক সিংগা গ্রামের একটি ভাড়া বাড়িতে। বাজারজাতকরণের জন্য আরেকটি বাসা ভাড়া নেওয়া হয় একই ইউনিয়নের বাউসা হেদাতীপাড়া গ্রামের ফাঁকা জায়গায়।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যার পর অভিযান চালিয়ে জব্দ করা প্রায় দুই ট্রাক পণ্য ঘটনাস্থলেই পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।

বৃহস্পতিবার রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাঘা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত জাহান অনন্যার নেতৃত্বে রাজশাহী ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জেলা তত্ত্বাবধায়ক মেহেদী আফজাল এবং বাঘা থানা-পুলিশের সহায়তায় কারখানাটিতে অভিযান চলছে। তালা খুলে ভেতর থেকে তৈরি পণ্য, ওষুধ তৈরির যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানান, জব্দ করা পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় দুই ট্রাক পণ্য ঘটনাস্থলেই পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।

ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তা মেহেদী আফজাল জানান, চক্রটি বিদেশি ব্র্যান্ড নকল করে ফুড সাপ্লিমেন্টের নামে এসব পণ্য তৈরি করছিল। প্রতিটি প্যাকেটের দাম ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। কারখানায় পাওয়া ‘কারকুমা’ নামের একটি প্যাকেটের দাম ২ হাজার ১৭০ টাকা, কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা একটি পণ্যের দাম ২ হাজার ৩৯৯ টাকা এবং মালয়েশিয়ার নাম ব্যবহার করা আরেকটি পণ্যের দাম ২ হাজার ২৯০ টাকা লেখা রয়েছে। এসব পণ্য মূলত অনলাইনে বিক্রি করা হতো। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হতো। অভিযানে কুরিয়ারে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা প্যাকেটও জব্দ করা হয়েছে। তিনি জানান বিষয়টি ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত। তাই তারা বিষয়টি আমলে নিয়ে মামলা করতে পারেন না।

তবে ট্যাবলেট তৈরির একটি যন্ত্র ভারী কারণে না সরিয়ে যন্ত্রটি অকেজো করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকার বনানী থানার পুলিশের একটি দল স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ওই কারখানায় অভিযান চালায়। এ সময় ৭ জনকে ধরে আনা হয়।

বনানী থানার পুলিশ ‘কারকুমা’ নামের একটি পণ্যের অভিযোগের সূত্র ধরে সেখানে গিয়েছিল। কারখানায় পাওয়া ওই নামের সব পণ্য তারা জব্দ করে নিয়ে যায়। অভিযুক্ত ২ জনকে বনানী থানার পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নেয়। তবে সহকারী কমিশনার তাঁদের নাম জানাতে পারেননি। তবে স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত সূত্র বলছে ওই দুই জনের একজনের নাম মজিবর অপরজনের নাম সুমন। তাদের বাড়ি নাটোর এলাকায়।

বাকি ৯ জনের মধ্যে ৫ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্য ৪ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মোট ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার রশিদে স্বাক্ষর করেন চারঘাটের ভায়ালক্ষ্মীপুর গ্রামের আবু সৈয়দ হোসেনের ছেলে খালিদ হাসান। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর ৪১ ধারায় তাঁকে জরিমানা করা হয়। সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার লক্ষ্মীকুল গ্রামের শ্রমিক দিলু মিয়া ও হাসমত। কারখানার মূল মালিককে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত জাহান অনন্যা।

কিন্তু জরিমানার ১ লাখ টাকা কে দিল, কার পকেট থেকে এল—সে বিষয়ে রহস্যজনকভাবে কেউ কোনো তথ্য দেননি। অন্য শ্রমিকদের নাম শাহাপরান, হৃদয়, সাইফুল, শাহাজালাল, মিলন ও শফিকুল। তাঁদের সবার বাড়ি নাটোরে বলে জানা গেছে।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ এই কারবারের সঙ্গে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী জড়িত রয়েছে। এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় ঘটনা আড়াল করে পুলিশসহ কয়েকজন ফায়দা লুটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, পুলিশের নাম ভাঙিয়ে বুধবার রাতে ৫০ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। তার নাম জানা গেলেও যোগাযোগ করে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তথ্য সংরক্ষিত আছে।

স্থানীয়রা জানান, বাইরে থেকে কারখানাটি সব সময় তালাবদ্ধ দেখা যেত। ধারণা করা হচ্ছে, পেছনের একটি দরজা দিয়ে লোকজন যাতায়াত করতেন। ভেতরে শোয়ার খাট, খাবারের থালাবাসন, এমনকি পানির নলকূপও পাওয়া গেছে। অর্থাৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সেখানেই শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাড়ির মালিক হায়দার আলী চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকেন। তাঁর ভাই শামীম ও মা রিনা বেগম জানান, প্রায় ছয় মাস আগে নাটোর এলাকার রেজাউল করিম মাসিক আট হাজার টাকা ভাড়ায় বাড়িটি নেন। রেজাউল করিম ‘নাটোর ভেষজ মার্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি জমা দিয়েছিলেন, যার মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ৫ মে পর্যন্ত। ট্রেড লাইসেন্সের তথ্য মতে রেজাউল করিমের বাড়ি নাটோர் সদর উপজেলার ৪ নম্বর লক্ষ্মীপুর খোসাবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের খোসাবাড়িয়া গ্রামে। ট্রেড লাইসেন্সে দেওয়া ফোন নম্বর বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি ২০০ টাকার ট্রেড লাইসেন্স ফি ও ১ হাজার টাকা দিয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ আয়ে ব্যবসা করেন।

মাসিক ৩ হাজার টাকায় চুক্তিতে উপজেলার বাউসা হেদাতীপাড়া গ্রামে আরেকটি বাসা ভাড়া নিয়েছেন গ্রামের রেজাউলের কাছ থেকে। রেজাউলের বোন রোজিনা এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, তাঁর ভাই ঢাকায় থাকে। তবে ভাড়ার কোনো লিখিত দলিল নেই। ভাড়ার টাকা বিকাশে পরিশোধ করেন।

দুই কোটি টাকার পণ্য, ১ লাখ টাকা জরিমানা, আর মূল মালিক ধরাছোঁয়ার বাইরে—এই অভিযান কি আসল অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা? কেন ৪ জনের জরিমানার টাকা কে দিল তা প্রকাশ করা হলো না? যে ঘর ভাড়া নিয়ে এই কারবার করছিল, তার নামই বা কেন সামনে আসছে না? প্রতারণা করে মানুষের ক্ষতি করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর কেনইবা জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে না।

এলাকাবাসীর দাবি, শুধু শ্রমিক ধরে আর পণ্য পুড়িয়ে এই চক্র বন্ধ হবে না। এর পেছনে থাকা মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করে নিয়মিত মামলা করতে হবে, নইলে বাঘা আবারও ভেজালের নিরাপদ স্বর্গ হয়ে উঠবে। বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সেরাজুল হক জানান, পুলিশের নাম ভাঙিয়ে টাকা নেওয়ার কথা শুনেছি। বিষয়টি আমলে নিয়ে ওই ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, কোনো পুলিশ সদস্য টাকা নেওয়ার সঙ্গে জড়িত নয়। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মামলা করতে চাইলে মামলা নেওয়া হবে।

আব্দুল হামিদ মিঞা
বাঘা, রাজশাহী
তারিখ: ০৬-১১-২০২৬