আলিফ হোসেন, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি
রাজশাহীর তানোরে ২০২৬ সালের এইচএসসি, আলিম ও কারিগরি (বিএমটি) পরীক্ষার ফলাফলে চরম হতাশাজনক চিত্র দেখা গেছে। এমন ফল বিপর্যয়ে অভিভাবক মহলে চরম ক্ষোভ-অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। অভিভাবক মহল ফল বিপর্যয়ে শিক্ষকদের দায়িত্বঅবহেলা ও স্কুল-কলেজ ফাঁকি দেওয়াকে দায়ী করছেন।
জানা গেছে, উপজেলার ১৭টি সাধারণ কলেজ, তিনটি আলিম মাদ্রাসা ও তিনটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের চেয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। সাধারণ কলেজগুলোতে পাসের হার ২৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ, আলিম মাদ্রাসায় ২৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং কারিগরি শাখায় মাত্র ১৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ তিন ধারার ২৩টি প্রতিষ্ঠানে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র সাতজন। ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি, মোবাইল ফোনে আসক্তি, শিক্ষকদের পাঠদানে অনীহা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকির ঘাটতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল অনুযায়ী, উপজেলার ১৭টি সাধারণ কলেজে মোট এক হাজার ৬৭৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৪৩৫ জন। ফেল করেছে এক হাজার ২৩৯ জন। পাসের হার ২৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এসব কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র সাতজন।
সাধারণ কলেজগুলোর মধ্যে তুলনামূলক ভালো ফল করেছে কৃষ্ণপুর আদর্শ মহিলা কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির ৫০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৩২ জন। পাসের হার ৬৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন একজন। অন্যদিকে, সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে কচুয়া আইডিয়াল কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির ৫৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র দুজন। পাসের হার ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। কচুয়া কলেজের এমপিও স্থগিতের দাবি করেছেন অভিভাবক মহল।
এদিকে উপজেলার অন্যতম বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি আব্দুল করিম সরকার কলেজের ফলাফলও হতাশাজনক। প্রতিষ্ঠানটির ৪১৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ১০১ জন। ফেল করেছেন ৩১৪ জন। পাসের হার ২৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এ ছাড়া তালন্দ ললিত মোহন কলেজে ১৮৪ জনের মধ্যে ৩৪ জন, এফ. এম. কলেজ মুণ্ডুমালা ১৯০ জনের মধ্যে ৫৫ জন, মুণ্ডুমালা মহিলা কলেজে ১৪৭ জনের মধ্যে ৬৫ জন এবং তানোর মহিলা কলেজে ১০৭ জনের মধ্যে ৩৩ জন পাস করেছেন।
অন্যদিকে, উপজেলার তিনটি আলিম মাদ্রাসায় মোট ৮১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৭৪ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন ১৯ জন এবং ফেল করেছে ৫৫ জন। উপস্থিত পরীক্ষার্থীর হিসাবে পাসের হার ২৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। মুণ্ডুমালা কামিল মাদ্রাসায় ৩৭ জন উপস্থিত পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৫ জন, চিনাশো আলিম মাদ্রাসায় ২১ জনের মধ্যে তিনজন এবং হাপানিয়া দোগাছিয়া আলিম মাদ্রাসায় ১৬ জনের মধ্যে মাত্র একজন পাস করেছেন। এসব মাদ্রাসা থেকে কেউ জিপিএ-৫ পাননি।
এদিকে কারিগরি শিক্ষার বিএমটি শাখার ফলাফল আরও হতাশাজনক। উপজেলার তিনটি প্রতিষ্ঠানে মোট ১০৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ১৫ জন। ফেল করেছেন ৯৪ জন। পাসের হার ১৩ দশমিক ৭৬ শতাংশ। তানোর পৌরসভা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজে ৬৬ জনের মধ্যে আটজন, তানোর মহিলা ডিগ্রি কলেজের বিএমটি শাখায় সাতজনের মধ্যে দুজন এবং কচুয়া টেকনিক্যাল ভোকেশনাল স্কুল অ্যান্ড কমার্শিয়াল কলেজে ৩৬ জনের মধ্যে পাঁচজন পাস করেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাননি।
অপরদিকে, ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা ও পাঠদান কার্যক্রমের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিভাবকগণ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তানোর উপজেলার একাধিক কলেজ অধ্যক্ষ বলেন, অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত কলেজে আসেন না। তাঁদের মধ্যে মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তিও রয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের পক্ষ থেকে সন্তানদের পড়াশোনার যথাযথ তদারকির অভাব রয়েছে। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে এবং ফলাফলেও তার প্রভাব পড়ছে।
এদিকে, শাফিউল, হাসান, কাউছার আহমেদসহ পাঁচ থেকে সাতজন অভিভাবক শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে অনীহা ও পাঠদানে ঘাটতির অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চেয়ে কিছু শিক্ষক বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, পে-স্কেল ও ছুটির সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেশি ব্যস্ত। অনেক শিক্ষক নিয়মিত ও নির্ধারিত সময়ে প্রতিষ্ঠানে আসেন না। কোনো কোনো কলেজে খণ্ডকালীন ও ভাড়াটিয়া শিক্ষক দিয়ে ক্লাস পরিচালনা করা হয়। অথচ মূল শিক্ষকেরা নিয়মিত পাঠদানে অংশ নেন না। এমনকি কিছু বিভাগে শিক্ষার্থী না থাকলেও শিক্ষক রয়েছেন বলে তাঁদের অভিযোগ। ফলে শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে নিজ নিজ বিষয়ের শিক্ষকদের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। তাঁদের প্রশ্ন, নিয়মিত পাঠদান ও তদারকি না থাকলে শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল আশা করা যায় কীভাবে?
এ বিষয়ে তানোর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এস এম মাহমুদ হাসান বলেন, ‘খোঁজখবর নিয়ে সমস্যাগুলো দেখব। এবার সারা দেশেই ফলাফল খারাপ হয়েছে।’ তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খান বলেন, ‘জবাবদিহির জন্য আমরা কাজ করব।’ তিনি ফলাফল বিপর্যয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দেন।