ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়ার স্টাফ রিপোর্টার: কুষ্টিয়া শহরের গড়াই নদীর তীরবর্তী চর থানাপাড়া এলাকায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বসবাসের এই জনপদে অন্তত এক হাজার মানুষ জ্বরসহ ডেঙ্গুর বিভিন্ন উপসর্গে ভুগছেন। তাদের অনেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। পরীক্ষায় অনেকের শরীরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে এই এলাকায়। গত সপ্তাহে ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন থানাপাড়ার বাসিন্দা রোকসানা খাতুন ও তার সন্তান রাইসা। পরে শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এছাড়া শ্যামলী খাতুন নামে আরও এক নারীর ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
সন্তান হারানোর শোক নিয়ে রোকসানা খাতুন জানান, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর তার সন্তানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত সন্তানকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
এদিকে থানাপাড়া এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়লেও মশা নিধন ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাদের দাবি, নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রম না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে অনেকে হাসপাতালে ছুটছেন। তবে চিকিৎসাসেবার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে কেউ কেউ বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে স্বাস্থ্য বিভাগ ও পৌর কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান তৎপরতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কুষ্টিয়া পৌরসভার প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পৌর প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কুষ্টিয়া জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। গত চার মাসে জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। এ সময়ে ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি একজন রোগীকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুর ঘটনাও স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ৭৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের একটি বড় অংশ থানাপাড়া এলাকার বাসিন্দা।
কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানান, জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আক্রান্তদের চিকিৎসার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ উপজেলার পাঁচটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য পৃথক সেল খোলা হয়েছে। এসব সেলে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে থানাপাড়ায় দ্রুত মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার, ডেঙ্গু আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে থানাপাড়ায় ডেঙ্গুর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।