আলিফ হোসেন, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডলের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের কথিত অভিযোগ এনে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমপি অনুসারীদের দাবি, একটি গোষ্ঠী অবৈধ সুবিধা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমপির পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই এসব অপপ্রচার শুরু করেছে। এদিকে এসব অপপ্রচারের খবর ছড়িয়ে পড়লে নির্বাচনী এলাকার বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি শান্তপ্রিয় সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি রাজশাহী নগরের অলোকার মোড়ের একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কিছু নেতাকর্মী এমন অভিযোগ করেছেন। রাজশাহী-৫ আসনের ভুক্তভোগী বিএনপির নেতাকর্মীর ব্যানারে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপির ব্যানারে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। কিন্তু পুঠিয়া ও দুর্গাপুর দুটি উপজেলা, পৌরসভা বা ইউনিয়ন বিএনপির দায়িত্বশীল কোনো নেতাকর্মীই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না। তাহলে এটা বিএনপির সংবাদ সম্মেলনের স্বীকৃতি পায় কি বিবেচনায়? তাহলে এরা কারা, তাদের উদ্দেশ্য কী—ইত্যাদি নিয়ে জনমনে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, উঠেছে সমালোচনার ঝড়, বইছে মুখরোচক নানা গুঞ্জন। প্রতিনিয়ত গুঞ্জনের ডালপালা মেলছে, এতে এমপিবিরোধীদের পায়ের নিচের মাটি সরে যেতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে পুঠিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক দেলোয়ার সরকার আল-আমীন, বানেশ্বর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম নবী ও সাবেক ছাত্রনেতা আহসান হাবিব কথা বলেন। এমপির কথায় তাদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা’ মামলা রেকর্ড করায় তারা পুঠিয়া থানার ওসিরও প্রত্যাহার দাবি করেন।
এদিকে পুঠিয়া ও দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপির নেতৃত্বে এদের অবদান কতটুকু এবং তাদের অবস্থান কী? তাহলে বিএনপির ব্যানারে তাদের সংবাদ সম্মেলনের হেতু কী? কার স্বার্থে তাদের এই সংবাদ সম্মেলন?
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এমপি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংসদ ভবনে দেখা করতে নিয়ে যান। সেদিন তার সঙ্গে পুঠিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পল্লব সেনগুপ্ত ও আওয়ামী লীগ কর্মী মাজহারুল ইসলাম মিন্টুকে সঙ্গে নিয়ে যান। তাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাওয়ায় বিএনপির নেতাকর্মীরা হতাশ, এটি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্যও ছিল হুমকি।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, একজন এমপি কি পুঠিয়া-দুর্গাপুর উপজেলার কয়েক লাখ মানুষের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয় মনে রাখতে পারেন? যদি এমন হয়, তাহলে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা কেন আগে বিষয়টি এমপিকে জানাননি? এর দায় এমপির ওপর চাপানো কতটা যৌক্তিক? এমপি কি কখনো কোনো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর বিষয়ে কোনো সুপারিশ করেছেন, কোথাও কোনো সভা-সমাবেশ বা বিবৃতি-বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীর পক্ষে কথা বলেছেন, কোনো অফিস-আলাদাতে আওয়ামী নেতাকর্মীর সুপারিশ করেছেন বা চাকরি-ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ করে দিয়েছেন? দেননি। তাহলে তিনি আওয়ামী লীগ পুনর্বাসিত করলেন কীভাবে? এসব কি নিছক পরিকল্পিত অপপ্রচার নয়?
এছাড়াও লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, পুঠিয়া-দুর্গাপুরের বেশিরভাগ সরকারি পুকুর এমপি নজরুল ইসলাম মণ্ডল আওয়ামী লীগের একজন অর্থদাতাকে দিয়ে চাষ করাচ্ছেন। এটাও সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। কারণ এমপি পুকুর ইজারা দেন না। সমিতির মাধ্যমে আবেদন করে উপজেলা জলমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি যাচাই-বাছাই করে পুকুর-জলাশয় ইজারা দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়েছে, টাকার বিনিময়ে তিনি ‘ফ্যাসিবাদ ও রাজাকার ঘরানার লোকজনকে’ ডিলার নিয়োগ দিতে তার প্যাডে এদের নাম ১ নম্বর সিরিয়ালে রেখে ডিলারশিপ পেতে সাহায্য করেছেন। এটাও ভিত্তিহীন, কারণ এমপির একার পক্ষে পুঠিয়া-দুর্গাপুরের কয়েক লাখ মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় জানার কথা নয়। এছাড়াও তিনি তো কারও বাড়ি গিয়ে সুপারিশ করেননি। তার কাছে যারা তাদের সুপারিশ করতে নিয়ে গিয়েছেন, সেই দায় তাদের, এখানে এমপির দোষ কোথায়? আবার সুপারিশ বা ডিলার নিয়োগে যদি কোনো অনিয়ম হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এমনকি এমপির কাছেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করতেই পারেন। কিন্তু সেটা না করে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত একজন দলীয় এমপির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সংবাদ করা মানেই দলের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করা। কারণ তিনি পুঠিয়া-দুর্গাপুরে বিএনপি তথা প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, সেই বিবেচনায় এমপির বিরোধিতা করা মানেই দল ও প্রধানমন্ত্রীর বিরোধিতা করা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, এলাকার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটিতে এমপি নজরুল ইসলাম মণ্ডল তার পরিবারের সদস্য, ফ্যাসিবাদের দোসর কিংবা জামায়াতের কাউকে সভাপতি ও সদস্য মনোনীত করেছেন। এসব অভিযোগও মনগড়া ও বাস্তববিবর্জিত। কারণ এমপির আত্মীয়স্বজন হলেই তারা কোনো প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারবেন না—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নাই।
এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি ও দলীয় অনুদান, ঈদের সময়ের বিশেষ বরাদ্দ এবং উন্নয়ন কাজের থোক বরাদ্দগুলো তিনি কোথায় কীভাবে খরচ করেন, তা দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এসব বরাদ্দের কাজ কোথায় কীভাবে হলো, সেটার জবাব এমপির কাছে চাওয়া কতটা যৌক্তিক? এসব বরাদ্দ নিয়ে যদি কোনো অনিয়ম হয়, তাহলে তারা সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত নিয়ে দলের চেয়ারম্যান বা নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে এমপির বিরুদ্ধে নালিশ করতে পারেন, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ব্যতিরেকে দলীয় এমপির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করতে পারেন না।
বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার অভিযোগ তুলে দেলোয়ার সরকার আল-আমীন বলেন, এমপির নানা অনিয়ম ও আওয়ামী প্রীতির ব্যাপারে দলীয় নেতাকর্মীদের কেউ ফেসবুকে মন্তব্য করলে তাকে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।
এসব অভিযোগও মনগড়া ও ভিত্তিহীন, কারণ একজন নির্বাচিত এমপির বিরুদ্ধে কেউ যদি ফেসবুকে অসত্য, মিথ্যা অপপ্রচার করে এবং এতে কেউ যদি তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেন, তাহলে তার দায় এমপির ওপর চাপানো কতটা যৌক্তিক?
এদিকে পুঠিয়া-দুর্গাপুর উপজেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ কথিত সংবাদ সম্মেলনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, একটি গোষ্ঠী অবৈধ সুবিধা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে এমপি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করেছেন।