বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি:
শারদীয় দুর্গোৎসব মানেই আগে ছিল ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ আর মায়ের প্রতি নীরব ভক্তি। কিন্তু এবার বিভিন্ন পূজা মণ্ডপ সরেজমিন ঘুরে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। আড়ম্বরে ঢাকা পড়ছে ভক্তি, শো-ই এখন পূজার মূল আকর্ষণ!
প্রতিমার উচ্চতা নিয়েও অলিখিত প্রতিযোগিতা, কে কার থেকে বড় প্রতিমা বানাতে পারে? ভক্তি নয়, উচ্চতাই যেন এখন মুখ্য। উপজেলায় ও শহরে ২০ ফুট থেকে ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যের পর্যন্ত প্রতিমা তৈরি হয়েছে।
আলোকসজ্জা ও ডিজে থিমের চমক মণ্ডপগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলে। প্রণাম করার জায়গা নেই, কিন্তু সেলফি জোন আছে সবার আগে।
মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতে দেখা গেছে হাতেগোনা কয়েকজনকে। বেশিরভাগ মানুষ আসছে ছবি তুলতে, ভিডিও করতে, শো দেখতে। যেন উৎসবটি ভক্তির চেয়ে বেশি প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় এক দর্শনার্থী অনুসা দে যথার্থই মন্তব্য করেছেন, "মানুষের মধ্যে ভক্তি কমছে আর হুজুকে চলা বাড়ছে"—সরেজমিনে তার প্রমাণ মিললো।
সারাদেশের ন্যায় রাজশাহীর বাঘায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, পারিবারিক বন্ধন ও তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও মন্ত্রোচ্চারণের পাশাপাশি পূজামণ্ডপগুলোতে চলছে ছবি তোলা, বন্ধুদের আড্ডা ও নানা আয়োজন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) উপজেলার নারায়ণপুর (পালপাড়া) সার্বজনীন দুর্গা মন্দির, আড়ানী ও বলিহার মন্দির ও পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের উপস্থিতি, আলোকসজ্জা ও উৎসবমুখর পরিবেশে মুখর হয়ে উঠেছে এলাকা।
এক প্রবীণ পুরোহিত নাম প্রকাশ না করে শর্তে বলেন, "আগে মানুষ মায়ের পায়ে ফুল দিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছু চাইতো, এখন মোবাইল খুলে ছবি তোলে। মায়ের মুখের দিকে তাকানোর সময় নেই কারো।"
আড়ম্বরের ভিড়ে ভক্তিটা যেন হারিয়ে না যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তবে আশার কথাও আছে: প্রশাসনের নজরদারি এবার অনেক ভালো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা চমৎকার। কিন্তু প্রশ্ন একটাই থেকে যায়—আমরা কি মা দুর্গাকে দেখতে যাচ্ছি, নাকি শুধুই আলোর ঝলকানি দেখতে ছুটছি?
কলেজ শিক্ষার্থী শান্ত মিঞা বলেন, উৎসব মানেই আনন্দ। বন্ধুদের সঙ্গে এমন প্রাণখোলা আড্ডা ঈদ ও পূজার সময়ই বেশি হয়। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে তাঁর ভালো লাগে।
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মন্দিরে ঘুরতে আসা অপূর্ব কুমার বলেন, অঞ্জলি দেওয়া ও পরিবারের সঙ্গে পূজায় অংশ নেওয়ার আনন্দ আলাদা।
পূজার ছুটিতে নিজ গ্ৰাম রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাঘা পৌরসভার নারায়নপুরে এসেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রথীন্দ্রনাথ দত্ত। পূজায় প্রতি বছর দরিদ্র হিন্দু মুসলিম সমাজের হাজারো লোকদের শাড়ি লুঙ্গি বিতরণ করেন। এবারও করবেন। তিনি বলেন, সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে সবাইকে মিলেমিশে শান্তি-শৃঙ্খলার সঙ্গে বসবাস করতে হবে। দুর্গাপূজা সত্য প্রতিষ্ঠা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং নির্যাতিত মানুষের পাশে থাকার শিক্ষা দেয়।
রাতে নারায়নপুর সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তকী ফয়সাল তালুকদার বলেন, দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতীক। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি বজায় রেখে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। বক্তব্য রাখেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সহকারী অধ্যাপক (অবঃ) জাহাঙ্গীর হোসেন, বাঘা প্রেস ক্লাবের আহ্বায়ক আব্দুল লতিফ মিঞা, আর আমিন জমাদার, হিমেল প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত জাহান অনন্যা, উপজেলা আনসার-ভিডিপি অফিসার সত্যজিৎ কুমার, প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের অফিসার মনসুর আলী, বাঘা পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সুরুজ্জামান সুরুজ, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল লতিফ প্রমুখ।
পূজা উদযাপন পরিষদের বাঘা শাখার সভাপতি সুজিত কুমার বাকু পান্ডে বলেন, পূজা মানে শুধু ঘোরাঘুরি নয়, সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো—দুটোই আমার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এবার উপজেলার ৪৭টি মন্দিরে পূজা উদযাপন হচ্ছে বলে জানান তিনি। মন্দির কমিটির সভাপতি মনি মোহন পান্ডে বলেন, সকলের সহযোগিতায় পূজার দিনগুলি ভালোভাবে পার হবে বলে আমরা আশাবাদী।
বাঘা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সেরাজুল হক বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে পূজা মণ্ডপে পুলিশ, আনসার ও ভিডিপি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।