ইসমাইল হোসেন বাবু, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ীতে সমাপ্ত হলো বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের মূল আনুষ্ঠানিকতা।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) তিন দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলার সমাপ্তির মাধ্যমে শেষ হয় এবারের সার্বিক আয়োজন। এর আগে রোববার দুপুরে চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে সাধু-ভক্তদের বহু প্রতীক্ষিত মিলনমেলার মূল পর্ব সাঙ্গ হয়েছিল।
সাধুসঙ্গের সমাপ্তির পরপরই হৃদয়ে গভীর শূন্যতা আর অশ্রুসিক্ত নয়নে সাঁইজির পবিত্র ধাম ছেড়ে নিজ নিজ ঠিকানায় ফিরতে শুরু করেছেন দেশ-বিদেশের হাজারো লালন অনুসারী ও অনুরাগী ভক্তকুল।
লালন সাঁইয়ের ঐতিহ্যবাহী নিয়ম ও রীতি অনুযায়ী ১ কার্তিক সন্ধ্যায় ‘অধিবাস’, ২ কার্তিক সকালে ‘বাল্যসেবা’ এবং দুপুরে ‘পূর্ণসেবা’র মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গের সমাপ্তি ঘটে। আনুষ্ঠানিকতা শেষে রোববার বিকেলেই লালন অনুসারীদের বড় একটি অংশ অতৃপ্ত ও ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আখড়াবাড়ী ছাড়তে শুরু করেন। বাকিরা সোমবার সকাল থেকে গুরুর বাণী ধারণ ও গুরুকার্য শেষ করে অশ্রুসিক্ত নয়নে লালনের এই তীর্থধাম ছেড়ে যান। তবে বিদায়ের এই ক্ষণেও তাদের অন্তরে জমা হয়ে থাকে পূর্ণতা সাধনের সেই চিরচেনা বাসনা আগামী দোল উৎসবে আবার ফিরে আসার ব্যাকুল অপেক্ষা।
প্রসঙ্গত, মানবতার পথপ্রদর্শক লালন সাঁইকে স্মরণ করতে এবং অবাধ্য মনকে শুদ্ধ করার আকুলতায় প্রতিবছরের মতো এবারও দেশ-বিদেশের হাজার হাজার লালন অনুসারী, ভক্ত-অনুরাগী ও দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছিল এই আখড়াবাড়ি।
তীর্থধামে আসা এক লালন ভক্ত বলেন, এখানে আমরা মূলত আত্মার শুদ্ধির জন্য আসি। বছরে দুইবার আমরা এই ধামে হাজির হই এক দোল পূর্ণিমায়, আর এই তিরোধান দিবসে। এখানে এলে অনেক দিন পর একে অপরের সঙ্গে দেখা হয়, ভাবের আদান-প্রদান করি। দুপুরে সাঁইজির পূর্ণসেবা গ্রহণ করে সাঁইজির বাণী নিয়ে আমরা নিজ নিজ ধামে ফিরে যায়। আর মনে মনে দিন গুনি পরবর্তী উৎসবে ফিরে আসার।
সাঁইজির দরবারে আসা মামুন সাধু নামের অপর এক অনুসারী বলেন, আমরা সাঁইজির দর্শন নিতে ও ভাবের আদান প্রদান করতে এখানে আসি। এখানে না এলে মনে শান্তি মেলে না। সাঁইজি তার বাণীতে মানবকল্যাণের কথাই সবচেয়ে বেশি বলে গেছেন। আমরা এসে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হই, নিজেদের মানবসেবায় উৎসর্গ করার প্রেরণা নিই। আর সাধারণ মানুষের মাঝে সাঁইজির মানবতাবাদী দর্শন ছড়িয়ে দিই, যাতে তারাও মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে পারে।
বাউলদের সাধনার ধাম দেখতে এসে মুগ্ধতার কথা জানান দর্শনার্থী রূপা খন্দকার। তিনি বলেন, জীবন এই প্রথম আমি লালন আখড়াবাড়িতে আসলাম। এসে যে অনুভূতি হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সবাই যার যার মতো ভক্তির কাজে মগ্ন। কোনো দর্শনার্থী তাদের কাছে গেলে তারা পরম মমতায় লালন সাঁইয়ের বাণী শুনিয়ে দিচ্ছেন। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সাধুরা গোল হয়ে লালনের গান পরিবেশন করছেন এই দৃশ্য হৃদয় ছুঁয়ে যায়। আগামী উৎসবেও আসার ইচ্ছা আছে।
প্রসঙ্গত, ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ভাবুক ও বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁই দেহত্যাগ করেন। তার তিরোধানের পর থেকেই অনুসারী ও ভক্তরা এই বিশেষ দিনে ছেঁউড়িয়ায় সমবেত হয়ে আসছেন। পরবর্তী সময়ে লালন একাডেমি ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে প্রতিবছর বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হয়ে আসছে এই লালন স্মরণ উৎসব।