আলমডাঙ্গা (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় প্রত্যাশা সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে ৫০টি হতদরিদ্র ও প্রতিবন্ধী পরিবারের মধ্যে নতুন বাড়ির চাবি হস্তান্তর করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও কষ্টের পর নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ায় পরিবারগুলোর মধ্যে আনন্দ ও আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আলমডাঙ্গা উপজেলার গোপালনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চিৎলা, খাদিমপুর ও গাংনী ইউনিয়নের ৫০টি হতদরিদ্র ও প্রতিবন্ধী পরিবারের সদস্যদের হাতে নতুন বাড়ির চাবি তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আলমডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আক্তার। তিনি বলেন, আজকের এই আয়োজন শুধু বাড়ির চাবি হস্তান্তরের অনুষ্ঠান নয়; এটি অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এবং একটি পরিবারকে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর দিন। যেসব পরিবার দীর্ঘদিন ভাঙা ঘরে কিংবা অনিরাপদ আশ্রয়ে কষ্ট করে জীবন কাটিয়েছে, তাদের হাতে নিজেদের ঘরের চাবি তুলে দেওয়া তাদের জীবনে নিরাপত্তা, স্বস্তি ও আশার নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে সন্তানদের নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা মায়েদের জন্য একটি নিরাপদ ঘর অনেক বড় প্রাপ্তি। একটি নিরাপদ আশ্রয় মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পাশাপাশি শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি ঘর শুধু ইট, বালু ও সিমেন্টের কাঠামো নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, সম্মান, আত্মমর্যাদা ও নতুন জীবনের স্বপ্ন। আজ যাঁরা ঘর পেয়েছেন, তাঁরা আমাদের সমাজেরই আপনজন। দারিদ্র্য কিংবা প্রতিবন্ধিতা কখনো একজন মানুষের মর্যাদা কমিয়ে দিতে পারে না। প্রত্যেক মানুষের নিরাপদে বসবাস ও সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়েই একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। নিরাপদ বাসস্থান একটি পরিবারের স্থিতিশীল জীবনের ভিত্তি। তবে শুধু ঘর পেলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; তাঁদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা সমন্বিতভাবে কাজ করলে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলো আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারবে। আমরা চাই, এই নতুন ঘরগুলো উপকারভোগী পরিবারগুলোর জীবনে নিরাপত্তা, স্বস্তি ও সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলে দিক। আমি আশা করি, সংস্থাটি ভবিষ্যতেও নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হলে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন আলমডাঙ্গা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. সাজ্জাদ হোসেন, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার প্রতিনিধি মো. জহুরুল ইসলাম এবং গোপালনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস খালেক।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রত্যাশা সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মো. বিল্লাল হোসেন। তিনি বলেন, প্রত্যাশা সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার লক্ষ্য শুধু বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া নয়; বরং অসহায় পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, সুস্থ পরিবেশ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। আজ ৫০টি পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দিতে পেরে আমরা আনন্দিত। আমাদের কাছে এই উদ্যোগ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং মানুষের জীবনে নিরাপত্তা, স্বস্তি ও নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টির একটি প্রচেষ্টা।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাই, এই ঘরগুলো প্রতিটি পরিবারের নতুন আশার ঠিকানা হয়ে উঠুক। এখানে শিশুরা নিরাপদে বেড়ে উঠুক, পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিন্তে বসবাস করুন এবং দীর্ঘদিনের দুঃখ-কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হোক। আমাদের বিশ্বাস, একটি নিরাপদ ঘর মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়। তবে টেকসই উন্নয়নের জন্য বাসস্থানের পাশাপাশি নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সচেতন মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রত্যাশা সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার সমন্বয়কারী সাইদুর রহমান। এ সময় সংস্থার পক্ষ থেকে প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার ও বিশেষ অতিথি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আক্তারসহ অতিথিদ্বয়কে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।
ঘর পাওয়া পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফরিদ হোসেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী নাজিম উদ্দিন এবং হতদরিদ্র পরিবারের সদস্য কুলছুম বেগম ও দিপা খাতুন। তাঁরা নতুন ঘর পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এ উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।