ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে উচ্চমূল্য ফসল হিসেবে শীতকালীন বিভিন্ন সবজি গ্রীষ্মকালে চাষ শুরু করেছেন কৃষকরা।
বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, টমেটোসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজি গ্রীষ্মকালে চাষ করে বেশি লাভবান হচ্ছেন তারা। অসময়ে এসব সবজির চাহিদা বেশি এবং দাম তুলনামূলক অনেক বেশি থাকায় কৃষকরা গতানুগতিক চাষাবাদ পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আগাম সবজি চাষে ঝুঁকেছেন।
আগাম এসব সবজি চাষে লাভ বেশি হলেও ঝুঁকি রয়েছে অনেক। অতিরিক্ত বৃষ্টি কিংবা উচ্চ তাপমাত্রা সব ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই মাঠে বিনিয়োগ করেন কৃষক।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের বড়বাড়িয়া গ্রামের মাঠ। এ মাঠে এক সময় শুধুমাত্র ধান এবং পাটের আবাদ হতো। বর্তমানে এ মাঠে আগাম শীতকালীন সবজি, মরিচ এবং গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষ হচ্ছে। ভালো দামের আশায় অনেক কৃষক আগাম ফুলকপি এবং বাঁধাকপি চাষ করেছেন। বাজারে বর্তমানে ৮০-১০-০ টাকা কেজিতে এসব ফুলকপি বিক্রি হলেও দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। হঠাৎ মারাত্মক রোগের আক্রমণে লোকসানের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
লাভ তো অনেক দূরের কথা, উৎপাদন খরচ এমনকি চাষের খরচও উঠছে না বলে জানান কৃষকরা। এদিকে মাঠে আবহাওয়াজনিত কারণে রোগ বাড়ায় তৎপর হয়ে কাজ করছে কৃষি বিভাগ।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যৌথভাবে রোগ দমনে কাজ করছে। মাঠ পর্যায় থেকে নমুনা সংগ্রহ করছেন তারা।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের বড়বাড়ীয়া মাঠপাড়া এলাকার কৃষক রাফিজুল ইসলাম। এ বছর এক বিঘা জমিতে আগাম ফুলকপি চাষ করেছেন। সেই সঙ্গে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষও করেছেন। চারা রোপণ থেকে শুরু করে ফুল আসার আগ পর্যন্ত তার ফুলকপির জমি থেকে মোটা অংকের টাকা লাভের আশা ছিল। কিন্তু ফুল ধরার পরে দেখা দিয়েছে রোগ। যার ফলে ফুল হওয়ার পর পরিপক্ক না হতেই পঁচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত লাভের আশায় আমি আগাম ফুলকপি চাষ করেছি। আজও কিছু ফুলকপি ৮০ টাকা কেজি করে বিক্রি করেছি। আমি এক বিঘায় ৩০ হাজার টাকা খরচ করেছি। আশা করেছিলাম দেড় লাখ টাকার ফুলকপি বিক্রি করব। কিন্তু কয়েকদিন আগে থেকে পঁচন দেখা দিয়েছে। কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। মাত্র পাঁচ হাজার টাকার ফুলকপি বিক্রি করেছি। এখন আর বিক্রি করতে পারব না। ক্ষেতেই নষ্ট হবে।
একই এলাকার কৃষক সামসুজ্জোহা জানান, আমাদের মাঠে এবার ফুলকপিতে কাণ্ড পঁচা, ঘাড় পঁচা, পাতা পঁচা, ফুল পঁচাসহ বিভিন্ন ধরনের রোগ দেখা দিয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের এ মাঠে আবাদ করাই দায় হয়ে যাবে।
এছাড়া বাঁধাকপিতে পোড়া রোগ দেখা দিয়েছে। যার কারণে পুরো জমির ফসল শেষ হয়ে যাচ্ছে।
বাঁধাকপি চাষি কলিম উদ্দীন জানান, গরমকালে কপি করলে বেশি লাভ হয়। আমার এক বিঘা জমিতে বাঁধাকপি চাষ করতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। হঠাৎ করে এ পোড়া রোগ লেগে আমার পুরো জমি শেষ করে দিয়েছে। বিক্রি যে করব, এটা কিনবে কে? গন্ধ বের হচ্ছে যা গরুও খাবে না। সারের দোকানে গেলে যে যা বলে তাই দিচ্ছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। একজন বলেছিল এমিস্টার টপ দিলে পঁচবে না। সেটা দেওয়ার কারণে আরও শুকিয়ে গেছে।
এলাকার সচেতন কৃষক রাকিবুল ইসলাম। তাদের এলাকায় এমন রোগ দেখা দেওয়ায় তিনি কৃষি অফিসে বিষয়টি জানান। তারপর তাৎক্ষণিক উপজেলা কৃষি অফিস এ রোগ দমনে তৎপর হয়ে ওঠে।
কৃষক রাকিবুল ইসলাম জানান, আমি মাঠে এ নতুন রোগ দেখার কারণে দ্রুত উপজেলা কৃষি অফিসারকে জানাই। তিনি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে লোক সঙ্গে নিয়ে এসে জমি দেখলেন, সমস্যা সমাধানে পরামর্শ দিলেন।
রাকিবুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি অফিস থেকে আগে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। সরকার যদি কৃষক পর্যায়ে মাটি ও বীজ শোধন সম্পর্কে আরও জানায় এবং কৃষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, তাহলে কৃষকরা উপকৃত হবে। এমন বীজবাহিত রোগের কারণে কষ্টের ফসল নষ্ট হতো না।
প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, এ রোগটি বীজ ও মাটিবাহিত রোগ এবং আবহাওয়াজনিত কারণে এর প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। এমন সমস্যা যাতে আর না হয় সেজন্য রোগের প্রতিরোধ ও প্রতিকারে কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছি।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ মামুন হোসেন জানান, আমরা প্রাথমিকভাবে ফুলকপি ও বাঁধাকপির রোগটি শনাক্ত করেছি। মাঠ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পাঠিয়েছি। মাটি ও বীজ শোধন না করা এবং বৃষ্টির কারণে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
আগাম উচ্চমূল্যের ফসল চাষের ক্ষেত্রে আধুনিক উপায়ে ফসল চাষাবাদ এবং মাটি ও বীজবাহিত রোগ দমনে বীজ ও মাটি শোধনের পাশাপাশি সঠিক সার ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে কৃষকদের সচেতন হতে হবে বলেও জানান এ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা।
এদিকে মাঠ পর্যায়ে ফসল চাষের পূর্বে মাটি শোধন এবং পুষ্টিমান পরীক্ষার কথা জানিয়েছেন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক গবেষণাগার কুষ্টিয়ার ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শফিকুল মওলা।
তিনি জানান, বর্তমানে কৃষকরা অনেকটাই বাণিজ্যিক ও লাভজনক কৃষিতে এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু কৃষকরা এখনও মাটি পরীক্ষার ব্যাপারে ততটা আগ্রহী হয়ে ওঠেননি। চাষের আগে স্বল্প খরচে মাটি পরীক্ষা করে সে অনুযায়ী চাষ করলে কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ অনেকটা কমবে।