এস কে বাবুল (বিশেষ প্রতিনিধি)

দোকান ভাড়ায় অগ্রিম (অ্যাডভান্স) প্রথা নিয়ন্ত্রণে সরকারি নীতিমালা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার প্রসারে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে। তরুণদের আত্মকর্মসংস্থানে উৎসাহিত করতে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও নানামুখী সহায়তা দেওয়া হলেও বাস্তবে ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে তারা একটি বড় বাধার মুখোমুখি হন। সেই বাধা হলো দোকান ভাড়ার নামে অতিরিক্ত অগ্রিম (অ্যাডভান্স) অর্থ প্রদানের প্রচলিত প্রথা। তাই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে সরকারিভাবে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও শহরের বাণিজ্যিক এলাকায় একটি দোকান নিতে গেলে ৫ লাখ, ১০ লাখ, ২০ লাখ, এমনকি ৫০ লাখ বা তারও বেশি টাকা অগ্রিম দিতে হয়। কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় এই অঙ্ক আরও বেশি। অথচ এত বিপুল পরিমাণ অগ্রিম দেওয়ার পরও ব্যবসায়ীদের প্রতি মাসে নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। ফলে নতুন উদ্যোক্তাদের মূলধনের একটি বড় অংশ বছরের পর বছর দোকান মালিকের কাছে আটকে থাকে।

ধরা যাক, একজন তরুণ উদ্যোক্তার হাতে ৫ লাখ টাকা রয়েছে। তিনি সেই অর্থ দিয়ে একটি ছোট ব্যবসা শুরু করতে চান। কিন্তু দোকান ভাড়া নিতে যদি ১০ লাখ টাকা অগ্রিম দিতে হয়, তাহলে তার পক্ষে ব্যবসা শুরু করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে। আবার কেউ ১০ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়ার পর প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধ করলে তার আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যায়। কারণ, ওই অর্থ ব্যাংক বা অন্য কোনো বৈধ বিনিয়োগে থাকলে সেখান থেকেও আয় করা সম্ভব হতো। অর্থাৎ ব্যবসায়ী একদিকে মূলধন আটকে রাখছেন, অন্যদিকে নিয়মিত ভাড়াও পরিশোধ করছেন।

এই অতিরিক্ত অগ্রিমের কারণে বহু সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা ব্যবসা শুরু করার আগেই পিছিয়ে পড়ছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে উচ্চ সুদে ঋণ নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ ব্যবসার পরিকল্পনাই বাতিল করে দিচ্ছেন। এতে শুধু ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতিও। নতুন উদ্যোক্তা কমে গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়, উৎপাদন ও বিনিয়োগের গতি কমে যায় এবং অর্থনীতির স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়।

শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, বিষয়টি সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশের অসংখ্য শিক্ষিত ও কর্মক্ষম যুবক সীমিত পুঁজি থাকার পরও ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না। কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে অনেকেই দীর্ঘদিন বেকার থাকছেন, হতাশায় ভুগছেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন।

যদি সরকার দোকান ভাড়ার অগ্রিমের বিষয়ে একটি যৌক্তিক ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করে এবং স্বল্প পুঁজির উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরু করার সুযোগ সহজ করে দেয়, তাহলে হাজার হাজার বেকার যুবক আত্মকর্মসংস্থানের পথে এগিয়ে আসতে পারবেন। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে।

কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেলে এর ইতিবাচক প্রভাব সমাজেও পড়বে। একজন তরুণ যখন সম্মানজনকভাবে নিজের আয়ের পথ তৈরি করতে পারেন, তখন তার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। বেকারত্ব ও হতাশা কমলে মাদকাসক্তি, চুরি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধও অনেকাংশে হ্রাস পেতে পারে। কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও মানবিক সমাজ গঠনেরও অন্যতম ভিত্তি।

এ কারণে সরকারিভাবে দোকান ভাড়া ও অগ্রিম গ্রহণের বিষয়ে একটি যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। সেই নীতিমালায় নিরাপত্তা জামানতের একটি যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ, লিখিত ভাড়া চুক্তি বাধ্যতামূলক করা, অস্বাভাবিক অগ্রিম আদায় নিরুৎসাহিত করা, ভাড়াটিয়াদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

অবশ্যই দোকান মালিকেরও ন্যায্য অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে নতুন উদ্যোক্তারা ব্যবসা শুরু করার সুযোগই হারিয়ে ফেলেন। একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা মালিক ও ভাড়াটিয়া—উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারে।

নতুন উদ্যোক্তা বাড়লে বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে, ভোক্তারা উন্নত সেবা পাবেন, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে। তাই দোকান ভাড়ায় অতিরিক্ত অগ্রিম গ্রহণের প্রচলিত প্রথা নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর সরকারি নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি।

সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান—স্বল্প পুঁজির উদ্যোক্তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত একটি স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত ও উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করুন। কারণ, একজন তরুণকে ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া মানে শুধু একটি দোকান চালু করা নয়; বরং একটি পরিবারকে স্বাবলম্বী করা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং একটি সমৃদ্ধ, অপরাধমুক্ত ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।