সিকদার শাহ আলম লিমনঃ

 

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলায় শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বইছে উৎসবের আমেজ। উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের বড়নগর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সাহা বাড়িতে এ বছরও ব্যাপক আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা, আকর্ষণীয় আলোকসজ্জা ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসবকে স্মরণীয় করে তুলতে কাজ করছেন আয়োজকরা।

 

বড়নগর সাহা বাড়ির এই ঐতিহ্যবাহী পূজার সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন সাহা পরিবারের কৃতী সন্তান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সিনিয়র সহসভাপতি এবং কয়ড়া কালীবাড়ি মন্দির কমিটির সভাপতি সুবাস সাহা। তাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধানে প্রতি বছরের মতো এবারও বৃহৎ পরিসরে ও জমকালো আয়োজনে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে পূজাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

 

মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু শারদীয় দুর্গোৎসবের ক্ষণগণনা

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে মহালয়া উদযাপনের মধ্য দিয়ে। গত ১০ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার মহালয়া উপলক্ষে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এরপর থেকেই বোয়ালমারীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রস্তুতির ব্যস্ততা বেড়েছে। প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা, পূজার উপকরণ সংগ্রহসহ নানা কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজক ও সংশ্লিষ্ট কারিগররা।

 

প্রতি বছরের মতো এবারও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, উৎসবের আনন্দ ও ঐতিহ্য বজায় রেখে পূজা উদযাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের আগমন, পূজার আনুষ্ঠানিকতা এবং ঢাক-ঢোলের বাদ্যে পুরো এলাকায় শারদীয় উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়বে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।

 

প্রতিমা নির্মাণ ও মণ্ডপ সাজানোর কাজ চলছে

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণ ও সাজসজ্জার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিমাশিল্পীদের নিপুণ হাতে মাটি, খড় ও অন্যান্য উপকরণে গড়ে উঠছে দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ এবং অসুরের প্রতিমা। প্রতিমায় রং ও অলংকারের কাজ সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মণ্ডপগুলোও ধীরে ধীরে পূর্ণতা পাচ্ছে।

 

বড়নগর সাহা বাড়ির পূজাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে মণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। উৎসবের দিনগুলোতে আলোকসজ্জায় পুরো এলাকা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা আয়োজকদের। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ঢাকের বাদ্য, কাঁসর-ঘণ্টার ধ্বনি এবং ধর্মীয় মন্ত্রোচ্চারণে পূজামণ্ডপগুলো মুখর হয়ে উঠবে।

 

ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির মিলনমেলা বড়নগর সাহা বাড়ি

বড়নগর সাহা বাড়ির দুর্গাপূজা স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহন করে আসছে। এই পূজাকে ঘিরে শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেই নয়, বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেও উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। প্রতি বছর পূজার সময় স্থানীয় বাসিন্দা, আত্মীয়স্বজন ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে এলাকাটি মিলনমেলায় পরিণত হয়।

 

আয়োজকদের মতে, দুর্গোৎসব ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। সব ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দ আরও বাড়ে। তাই নির্বিঘ্ন, শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে পূজা উদযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

 

বোয়ালমারীর ২২৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন

এ বছর বোয়ালমারী উপজেলায় একটি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়নজুড়ে মোট ২২৫টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন চলছে বলে জানা গেছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পূজাকে কেন্দ্র করে প্রস্তুতি ও সাজসজ্জার কাজ এগিয়ে চলছে।

 

উল্লেখযোগ্য পূজামণ্ডপগুলোর মধ্যে রয়েছে বড়নগর সাহা বাড়ি, ময়েনদিয়া শ্রীনগর জমিদার বাড়ি, গোহাইলবাড়ি কর বাড়ি, বোয়ালমারী পৌরসদরের সার্বজনীন বাজার মন্দির এবং খাইলপাড়া নন্দী বাড়ির পূজা। এসব মণ্ডপে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি প্রতিমা, মণ্ডপসজ্জা ও আলোকসজ্জায় বিশেষ আকর্ষণ তৈরির প্রস্তুতি চলছে।

 

উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দর্শনার্থীদের সমাগমকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে উৎসবের আমেজ আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

পূজার দিনক্ষণ ঘিরে ভক্তদের প্রস্তুতি

সনাতন ধর্মীয় রীতি ও প্রচলিত পঞ্জিকা অনুসারে দুর্গাপূজার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পালিত হবে। এ সময় দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ, অধিবাস, সপ্তমী, মহাষ্টমী, সন্ধিপূজা, মহানবমী এবং বিজয়া দশমীর বিভিন্ন ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করা হবে।

 

চলতি বছরের পূজাকে ঘিরে ভক্তদের মধ্যে ইতোমধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। নতুন পোশাক কেনাকাটা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ, মণ্ডপ পরিদর্শন এবং পূজার আনুষ্ঠানিকতায় অংশগ্রহণের পরিকল্পনা করছেন অনেকে। পূজার দিনগুলোতে এলাকার বিভিন্ন স্থানে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

নিরাপত্তায় প্রশাসনের নজরদারির প্রস্তুতি

দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলার প্রতিটি পূজামণ্ডপে নজরদারি রাখা হবে বলে জানা গেছে। উৎসব চলাকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

আয়োজকরাও উৎসবের পরিবেশ বজায় রাখতে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন। ধর্মীয় সম্প্রীতি, সামাজিক সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অটুট রেখে দুর্গোৎসব উদযাপনের প্রত্যাশা তাঁদের।

 

আনন্দ, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির অপেক্ষায় বোয়ালমারী

সব মিলিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে বোয়ালমারীতে তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। ঐতিহ্যবাহী বড়নগর সাহা বাড়ির বৃহৎ আয়োজন এবারও দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রতিমার সৌন্দর্য, মণ্ডপের সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা এবং ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়বে পুরো এলাকায়।

 

আয়োজক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, পারস্পরিক সম্প্রীতি, সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গাপূজা সবার জন্য আনন্দময় ও স্মরণীয় হয়ে উঠবে।