নুরুল ইসলামঃ

 

ফরিদপুরের নগরকান্দায় সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ লেনদেন ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলেছেন ডিলারশিপ থেকে বঞ্চিত অর্ধশতাধিক আবেদনকারী। যোগ্যতা ও সরকারি শর্ত পূরণ করেও ডিলারশিপ না পাওয়ার দাবি তুলে নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

 

রোববার (১১ অক্টোবর) সকালে নগরকান্দা প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন বঞ্চিত আবেদনকারীরা। তাঁদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শাহীন মুন্সী।

 

লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণকারী আবেদনকারীদের বাদ দিয়ে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাবশালীদের সুপারিশ এবং অর্থ লেনদেনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন অভিযোগকারীরা।

 

সংবাদ সম্মেলনে আবেদনকারীরা দাবি করেন, ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা-সালথা) আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ডিলার নিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম সুপারিশ করেননি। বরং যাঁদের নিজস্ব গোডাউন রয়েছে এবং সরকারি নীতিমালার শর্ত পূরণ করেছেন, তাঁদের মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তাঁরা।

 

এ সময় নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদারের বিরুদ্ধে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়।

 

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও একাধিক আবেদনকারী ডিলারশিপ পাননি। অন্যদিকে, নিজস্ব গোডাউন না থাকা এবং ভাড়া করা ঘর ব্যবহারকারী কয়েকজনকে ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

 

লিখিত বক্তব্যে আরও অভিযোগ করা হয়, উপজেলার কাইচাইল ইউনিয়নে কামাল সিকদার, ডাঙ্গী ইউনিয়নে আবু সাঈদ মুন্সী এবং লস্করদিয়া ইউনিয়নে শাহিনুর নামে ব্যক্তিদের সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের কয়েকজনের যোগ্যতা, গোডাউনের মালিকানা ও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বঞ্চিত আবেদনকারীরা।
এ ছাড়া লস্করদিয়া ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া শাহিনুর এর আগে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চালের ডিলার হিসেবেও নিয়োগ পেয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।

 

রামনগর ও ফুলসুতি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তোলেন আবেদনকারীরা। তাঁদের দাবি, সরকারি শর্ত পূরণ করে আবেদন করলেও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। এ কারণে নিয়োগে অনুসরণ করা মানদণ্ড, যাচাই-বাছাইয়ের প্রতিবেদন এবং প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়া প্রকাশের দাবি জানান তাঁরা।

 

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ।

অভিযোগের বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “আমরা প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে তিনজন করে যোগ্য প্রার্থীর নাম পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় যাঁদের যোগ্য মনে করেছে, তাঁদের নিয়োগ দিয়েছে।

 

অভিযোগকারীরা বলছেন, বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নীতিমালায় কোথাও বলা নেই যে বিএনপির লোকদেরই নিয়োগ দিতে হবে।”

 

অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “অভিযোগ করা সহজ। তাঁরা আমাদের বিরুদ্ধে টাকা-পয়সার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের কাছে তথ্য-প্রমাণ থাকলে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, “কৃষি মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর আমরা চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করি। ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন ইউএনও মহোদয় এবং আমি ছিলাম সদস্যসচিব। যাচাই-বাছাই শেষে যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। এখানে আমাদের অনিয়ম করার কোনো সুযোগ নেই।”

 

অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার বলেন, “এই নিয়োগ কমিটি বা নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। যাঁরা অভিযোগ করছেন, তাঁরা হয়তো না বুঝে করছেন, অথবা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে আমার সম্মান ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছেন।”

 

তিনি আরও বলেন, “যতটুকু শুনেছি, যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের ৯৯ শতাংশ বিএনপির লোক। দু-একজনকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না।”

 

সংবাদ সম্মেলনে বঞ্চিত আবেদনকারীরা সার ডিলার নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে নিয়োগে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্য আবেদনকারীদের যথাযথ মূল্যায়নের আহ্বান জানান তাঁরা।