আনসার আহমেদ উল্লাহঃ
কেবল স্ট্রিটের আন্দোলনের ৯০তম বার্ষিকী উপলক্ষে রবিবার লন্ডনের পূর্ব লন্ডনে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেছেন। মিছিল থেকে উগ্র ডানপন্থা ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।
৪ অক্টোবর ২০২৬ অনুষ্ঠিত এই মিছিলটি পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলের টাওয়ার হ্যামলেটস টাউন হল থেকে শুরু হয়ে কেবল স্ট্রিটের সেন্ট জর্জেস গার্ডেনস পর্যন্ত যায়। ১৯৩৬ সালের ঐতিহাসিক সংঘর্ষের স্মরণে এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
কেবল স্ট্রিটের আন্দোলনের সময় বিক্ষোভকারীরা অসওয়াল্ড মোসলির নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ ইউনিয়ন অব ফ্যাসিস্টস এর মিছিলকে পূর্ব লন্ডনের মধ্য দিয়ে যেতে বাধা দিয়েছিলেন। সে সময় ইহুদি জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ বসবাস করত এমন এলাকায় ব্রিটিশ ইউনিয়ন অব ফ্যাসিস্টস এর মিছিল করার সিদ্ধান্তকে একটি পরিকল্পিত উসকানি হিসেবে দেখা হয়েছিল। এর প্রতিবাদে ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগঠনগুলো হাজার হাজার মানুষকে সংগঠিত করে মিছিলটি প্রতিহত করার উদ্যোগ নেয়।
কেবল স্ট্রিট ৯০ ব্যানারের নেতৃত্বে মিছিলে টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং কেবল স্ট্রিটের আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। মিছিলে আরও অংশ নেয় টাওয়ার হ্যামলেটসের বিভিন্ন স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠন, আলতাব আলী ফাউন্ডেশন, স্বাধিনতা ট্রাস্ট, আলতাব আলী ট্রাস্ট, বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স কাউন্সিল, নিজের মানুষ, ইন্টারন্যাশনাল ব্রিগেডস মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, একটি রেড ব্লক, ফ্যাসিবাদবিরোধী ও বর্ণবাদবিরোধী সংগঠন এবং বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন সহ আরও অনেক সংগঠন।
মিছিলের পর অনুষ্ঠিত সমাবেশে টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র লুৎফুর রহমান বলেন, “অভিবাসন, অভিবাসী এবং এই এলাকার আদি বাসিন্দারা সবাই মিলে টাওয়ার হ্যামলেটসকে আজকের এই গ্রেট বারাতে পরিণত করেছেন।” তিনি আরও বলেন: “১৯৩০-এর দশক এবং ১৯৪০-এর দশকের শুরুর সময়টি ছিল বিশ্ব ইতিহাসের এক ভয়াবহ, ভয়াবহ অধ্যায়। মোসলে সারা দেশে তাণ্ডব চালিয়েছিলেন এবং টাওয়ার হ্যামলেটসেও তাণ্ডব চালানোর চেষ্টা করেছিলেন। “আমাদের পূর্বপুরুষরা বলেছিলেন, ‘না, তোমরা এখানে আসতে পারবে না। তোমাদের আমাদের এলাকায় অতিক্রম করতে দেওয়া হবে না।’ এবং তারা অতিক্রম করতে পারেনি।
সাবেক লেবার নেতা এবং ইসলিংটন নর্থের এমপি জেরেমি করবিন ফারাজ, রিফর্ম এবং অন্যদের ব্যবহৃত “বর্তমান সময়ের বর্ণবাদী ভাষার” সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, তারা “শরণার্থী ও অভিবাসীদের দোষারোপ করছে”। মি. করবিন বলেন, “বর্ণবাদবিরোধিতা মানে আমরা বর্ণবাদের প্রতিটি রূপের বিরোধিতা করি, সেটি যে রূপেই হোক, যেখানেই মাথা তুলুক না কেন। কারণ এটি সেই ঐক্যকে ধ্বংস করে, যা আমাদের সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার জন্য প্রয়োজন।” “আজ আমরা আবারও বলছি: ফ্যাসিস্টরা, উগ্র ডানপন্থীরা, কখনোই টাওয়ার হ্যামলেটসে তাণ্ডব চালাতে পারবে না।”
৯০তম বার্ষিকীর কর্মসূচি শুরু হয় টাওয়ার হ্যামলেটস টাউন হলে একটি সমাবেশের মধ্য দিয়ে। সমাবেশটি পরিচালনা করেন জিএফটিইউ-এর গাওয়াইন লিটল এবং এসইউটিআর-এর সামিরা আলী। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র লুৎফুর রহমান, স্টিভ রাইট, মাইকেল রোজেন, মেগান ডবনি এবং তাজ আলী।
এরপর মিছিলকারীরা টাওয়ার হ্যামলেটস টাউন হল থেকে কেবল স্ট্রিটের সেন্ট জর্জেস গার্ডেনসের দিকে যাত্রা করেন। সেখানে বক্তিতা, কবিতা ও সংগীতের মধ্য দিয়ে বার্ষিকীর কর্মসূচি শেষ হয়।
সেন্ট জর্জেস গার্ডেনসের সমাবেশে বক্তব্য দেন টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র লুৎফুর রহমান , কেবল স্ট্রিটের আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা এবং বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন, রাজনৈতিক ও কমিউনিটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা। ট্রেড ইউনিয়নগুলোর মধ্যে ছিল আরএমটি, ইউনিসন, ইউনাইট, পিসিএস, এনইইউ, জিএফটিইউ, টিইউসি, এফবিইউ এবং টাওয়ার হ্যামলেটস ট্রেডস কাউন্সিল।
সমাবেশটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন জুইস সোশ্যালিস্ট গ্রুপের ডেভিড রোজেনবার্গ, সিপিবির লোরেন ডগলাস এবং স্বাধিনতা ট্রাস্টের জুলি বেগম।
বক্তাদের মধ্যে ছিলেন সিপিবির অ্যালেক্স গর্ডন, কেবল স্ট্রিটের আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য রুথ লেভিটাস, মাইকেল রোজেন, টনি বুথ, জুন লেগ এবং মিশেল কার্টার। এছাড়াও বোগোতা, ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি এবং আয়ারল্যান্ড থেকে আন্তর্জাতিক বক্তারা অংশ নেন। অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন ইসলিংটন নর্থের এমপি জেরেমি করবিন, পপলার অ্যান্ড লাইমহাউসের এমপি আপসানা বেগম, আলতাব আলী ফাউন্ডেশনের জালাল রাজনউদ্দিন, জিউইশ সোশ্যালিস্টস’ গ্রুপের জুলিয়া বার্ড, স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজমের ওয়েম্যান বেনেট, ওয়ার্কার্স কাউন্সিলের শাহরিয়ার বিন আলী এবং টুগেদার অ্যালায়েন্সের কেভিন কোর্টনি।
অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করে গ্রেট ইয়িদিশ প্যারেড, আরএমটি ফিশবার্ন কলিয়ারি ব্যান্ড, ইয়াং ‘আনস, মাইকেল রোজেন এবং চিপ হ্যামার।
৯০তম বার্ষিকীর এই কর্মসূচিতে ইহুদি, বাঙালি, আইরিশসহ বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, রাজনৈতিক সংগঠন এবং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মীরা একত্রিত হন। ১৯৩৬ সালের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করার পাশাপাশি বর্ণবাদ ও উগ্র ডানপন্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।