আশরাফুজ্জামানঃ

 

প্রথমবার বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে মাছ ধরা ট্রলারে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট (স্টারলিংক) স্থাপন করেছেন সুশীলন লিমিটেড ও এপনিক ফাউন্ডেশন।

 

পাথরঘাটার বিএফডিসি পয়েন্ট থেকে ৭০ কিলোমিটার গভীর সমুদ্রে স্টারলিংক মিনি কিট দিয়ে মাছ ধরা ট্রলারে সফলভাবে ইন্টারনেট সংযোগ পরীক্ষা করেছে সুশীলন লিমিটেড। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক এপনিক ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগিতায় ১৪ সেপ্টেম্বর এ পরীক্ষা পরিচালিত হয়।

 

“নিরাপদ হলো সাগর, ইন্টারনেটের সংযোগে” স্লোগানকে সামনে রেখে বাস্তবায়িত এ উদ্যোগের আওতায় তিনটি মাছ ধরার ট্রলারে সৌরবিদ্যুৎচালিত স্টারলিংক মিনি কিট স্থাপন করা হয়েছে। সুশীলন লিমিটেডের দাবি, বাংলাদেশে প্রান্তিক গভীর সমুদ্রগামী জেলেদের জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে এ ধরনের উদ্যোগ এটিই প্রথম।

 

প্রকল্প দলের পর্যবেক্ষণে, প্রায় ৩৪ কিলোমিটার পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে মোবাইল নেটওয়ার্কে কথোপকথন ও ভিডিও কল সম্ভব হয়েছে। তবে ৩৫–৫০ কিলোমিটার অংশে সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মূলত টুজি নেটওয়ার্কে কথা বলা যায়। ৫০–৬৫ কিলোমিটার দূরত্বে মোবাইলে মাঝে মাঝে নেটওয়ার্ক দেখা গেলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

 

৬৬ কিলোমিটার অতিক্রম করার পর পরীক্ষাস্থলে প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়নি। একই সময়ে ব্যবহৃত স্টারলিংক মিনি কিটের সাধারণ রোমিং সেবায়ও সংযোগ পাওয়া যায়নি। এরপর ‘ওশান মোড’ চালু করলে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া যায়। এ সময় নৌকার মালিক গোলাম রব্বানি গভীর সমুদ্র থেকে প্রথমবারের মতো পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। সুশীলন লিমিটেডের গবেষক দল এই রিসার্চের সফলতা হিসাবে চিহ্নিত করে।

 

১৩ সেপ্টেম্বরের কার্যক্রমে স্টারলিঙ্কের মিনি কিট জেলেদের মাঝে বিতরনের উদ্বোধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, সমুদ্রে মিনি কিট সংযোগ পরীক্ষা এবং নৌকার মালিক ও প্রধান মাঝিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তিনটি কিট বুঝিয়ে দেওয়া হয়। এতে সুশীলন লিমিটেডের গবেষক ও কর্মকর্তাগণ, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন।

 

১৫ সেপ্টেম্বর পাথরঘাটা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে ২৮ জন তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং সমুদ্র পরীক্ষার ফলাফল তুলে ধরা হয়। এ সময় উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছে সেবাটির সুবিধা ও ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতাও উপস্থাপন করা হয়।প্রকল্পের পরীক্ষায় ব্যবহৃত স্টারলিংক রোমিং প্যাকেজের মাসিক খরচ ১২ হাজার টাকা। সমুদ্রে ‘ওশান মোড’ ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত প্রতি জিবি ডেটায় ২৫২ টাকা প্রদান করতে হবে। দলের মতে, এ ব্যয় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত ট্রলারমালিকদের জন্য বহন করা কঠিন, যা সেবাটি নিয়মিত ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

 

প্রকল্পটি পাথরঘাটা উপজেলা ১৩ মাস ব্যাপী ১ অক্টোবর ২০২৫ থেকে ৩০ অক্টোবর ২০২৬ পরিচালিত হচ্ছে। বাস্তবায়িত প্রকল্পে তিনটি মাছ ধরার নৌকায় সৌরবিদ্যুৎচালিত স্টারলিংক মিনি কিট স্থাপন করা হয়েছে এবং আরো ২ টি স্ট্যান্ডার্ড কিট কমিউনিটির মাঝে বিতরণ করা হবে, যা গভীর সমুদ্র এবং স্থানীয় মানুষের মাঝে দুর্যোগকালীন সময়ে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভভ হবে।

 

প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে দুই ব্যাচে মোট ৫৬ জন স্থানীয় তরুণ-তরুণীকে দুর্যোগকালীন যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে আটটি সচেতনতা সেশন আয়োজন এবং পোস্টার, লিফলেট ও ব্রোশিয়ার বিতরণের মাধ্যমে উপকারভোগীদের কাছে নিরাপদ যোগাযোগ ও দুর্যোগ প্রস্তুতির বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

 

উদ্যোগটির লক্ষ্য গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা জেলেদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস, দুর্যোগের সতর্কবার্তা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মাছের বাজারদর জানার সুযোগ তৈরি করা। এর মাধ্যমে জেলেদের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি দুর্যোগজনিত ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে প্রকল্প দল।