ইসমাইল হোসেন বাবু:
দিনের বেলা পদ্মাতীরের সাদিপুর নৌকাঘাট-সংলগ্ন এলাকা থাকে অনেকটাই নীরব। তবে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলেই সেখানে শুরু হয় ব্যস্ততা। সবুজ রঙের ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা শত শত পুরোনো ব্যাটারি রাতের আঁধারে উন্মুক্ত স্থানে ভাঙা হয়। এরপর কয়লা ও কাঠের আগুনে এসব ব্যাটারি পুড়িয়ে বের করা হয় সিসা। প্রায় দুই মাস ধরে এভাবেই পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম চলার অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে গত শুক্রবার বিকেল ও মধ্যরাতে সরেজমিনে গিয়ে এসব কার্যক্রমের চিত্র দেখা যায়। সাদিপুর নৌকাঘাট-সংলগ্ন এলাকাটি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চরসাদিপুর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। তবে অভিযোগ রয়েছে, নদীর ওপারের পাবনার বাসিন্দা মনির হোসেন এ কারখানাটি পরিচালনা করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পুরোনো সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের জন্য কারখানাটি অপরিকল্পিত ও অনিরাপদভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ তাদের। কারখানা থেকে নির্গত সিসাযুক্ত ধোঁয়া, দূষিত ধূলিকণা ও রাসায়নিক পদার্থ মাটি, পানি ও বাতাসে মিশে স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
কারখানাটির পাশেই রয়েছে দেলোয়ার হোসেনের একটি ইটভাটা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, পাবনার বাসিন্দা মনির হোসেন স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ম্যানেজ করে এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। মাসে লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে অবৈধভাবে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা বের করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। এতে পরিবেশের পাশাপাশি কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ তার। বারবার নিষেধ করা হলেও কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বলে জানান তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক জানান, তারা প্রায় দেড় মাস ধরে সেখানে কাজ করছেন। তবে কারখানার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে মালিক মনির হোসেনের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তারা।
কারখানার মালিক মনির হোসেনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা বের করার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তার দাবি, সংশ্লিষ্ট সবাইকে ‘ম্যানেজ’ করেই দেড় মাস ধরে কারখানাটি চালানো হচ্ছে। বাতাসের কারণে অধিকাংশ দিনই কাজ বন্ধ রাখতে হয় এবং ব্যবসায় তেমন লাভ হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।
স্থানীয় এক কৃষক জানান, দিনের বেলায় কারখানায় তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না। রাত সাড়ে ১১টার পর ট্রাকভর্তি পুরোনো ব্যাটারি সেখানে আনা হয়। রাত ১২টার দিকে ব্যাটারি পোড়ানোর জন্য আগুন জ্বালানো হয়। তার অভিযোগ, চরসাদিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাফিজুর রহমান টিক্কা, বিএনপি কর্মী জালাল ও হযরত স্থানীয়ভাবে কারখানা মালিককে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে নদীসংলগ্ন এলাকার কলা, সবজিসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা হাফিজুর রহমান টিক্কা। তিনি বলেন, “কারা কী করতেছে জানি নে। আমি এসবে নেই। আপনারা মনিরের সঙ্গে মিলতাল করে নেন।”
চরসাদিপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম আজম বলেন, এই কারখানার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িত নন।
এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাভিদ সারওয়ার বলেন, শিগগিরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবৈধ ব্যাটারি কারখানায় অভিযান চালানো হবে।
কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট হাবিবুল বাসার বলেন, ব্যাটারির ভেতরে সালফিউরিক অ্যাসিড থাকে। উন্মুক্ত স্থানে এসব ব্যাটারি ভেঙে সিসা বের করলে বাতাসে সিসা ও লেডের মাত্রা বেড়ে যায়, যা পরিবেশ ও মাটির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
স্থানীয়দের দাবি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সম্ভাব্য ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে অবৈধভাবে ব্যাটারি পোড়ানোর এ কার্যক্রম দ্রুত বন্ধ করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।