আনসার আহমেদ উল্লাহঃ

 

টাওয়ার হ্যামলেটসে ব্রিটিশ বাঙালি কমিউনিটির ফুটবলের গত ৫০ বছরের প্রায় অনথিভুক্ত ইতিহাস তুলে ধরা ও সংরক্ষণের জন্য একটি নতুন ঐতিহ্যবিষয়ক প্রকল্প শুরু হয়েছে।

 

‘বেঙ্গল ইউনাইটেড: দ্য স্টোরি অব ব্রিটিশ বাংলাদেশি ফুটবল ইন টাওয়ার হ্যামলেটস’ নামের এই প্রকল্পটি স্বাধিনতা ট্রাস্টের উদ্যোগে এবং দ্য ন্যাশনাল লটারি হেরিটেজ ফান্ডের সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৭০-এর দশকে লন্ডনের ইস্ট এন্ডে বিপুলসংখ্যক বাঙালির আগমন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত কমিউনিটির ফুটবলের বিকাশের ইতিহাস এতে তুলে ধরা হবে।

 

প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও লেখক তারিক হুসেইন। টাওয়ার হ্যামলেটসে বেড়ে ওঠা তারিক একসময় স্টেপনি এফসি, স্পোর্টিং বেঙ্গল এবং বিউমন্ট অ্যাথলেটিকসহ বাংলাদেশি-প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন দলের হয়ে ফুটবল খেলেছেন। আগামী এক বছর তিনি তরুণ স্বেচ্ছাসেবক ও কমিউনিটির সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের স্থানীয় ফুটবলের ছবি, নথিপত্র, স্মারক এবং মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ সংগ্রহ করবেন।

 

তারিক হুসেইন বলেন, “টাওয়ার হ্যামলেটসে বেড়ে ওঠা আমার মতো মানুষের জন্য ফুটবল কখনোই শুধু একটি খেলা ছিল না। এখানেই বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে, আমরা কমিউনিটি খুঁজে পেয়েছি এবং অনেকের মতো আমরাও প্রথম অনুভব করতে শুরু করেছি যে লন্ডনের এই অংশটিও আমাদের।” তিনি বলেন, ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জীবনে ফুটবল বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, ১৯৭০-এর দশকে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভূমিকা রাখা থেকে শুরু করে ১৯৯০-এর দশকে মাদক ও মাদকাসক্তির মতো সামাজিক সমস্যার সময় তরুণদের ইতিবাচক কাজে যুক্ত রাখা পর্যন্ত।

 

“ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জীবনে ফুটবল নানা ধরনের ভূমিকা পালন করেছে,” বলেন তারিক। “প্রথমদিকে দলগুলো ও যুব সংগঠনগুলো বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল। ১৯৯০-এর দশকে যখন মাদক ও মাদকাসক্তি আমাদের কমিউনিটির বিভিন্ন অংশকে বিপর্যস্ত করছিল, তখন ফুটবল অনেক তরুণের জন্য বাইরে বেরিয়ে আসার, ইতিবাচক কিছু করার এবং অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষদের অনুসরণ করার সুযোগ তৈরি করেছিল।”

 

তিনি আরও বলেন, ফুটবল সফর তরুণ ইস্ট এন্ডবাসীদের ব্রিটেনের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিদেশে নিয়ে গিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার পরিধি বাড়িয়েছে। বর্তমানে গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ের টুর্নামেন্টগুলো ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের তাদের বাবা-মা ও জন্মভূমির সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলতেও সহায়তা করছে।

 

গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও টাওয়ার হ্যামলেটসে সংগঠিত বাংলাদেশি ফুটবলের ইতিহাস কখনোই পূর্ণাঙ্গভাবে নথিবদ্ধ করা হয়নি। প্রথমদিকের অনেক দলের সঙ্গে যুক্ত মানুষ এখন প্রবীণ, আবার অনেকে ইতিমধ্যে মারা গেছেন। অন্যদিকে পুরোনো ছবি, দলের জার্সি, প্রচারপত্র ও অন্যান্য স্মারক ব্যক্তিগত সংগ্রহে রয়ে গেছে এবং সংরক্ষণ না করা হলে সেগুলো হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

স্বাধিনতা ট্রাস্টের সভাপতি জামিল ইকবাল বলেন, “টাওয়ার হ্যামলেটসে ব্রিটিশ বাংলাদেশি অভিজ্ঞতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অথচ অনথিভুক্ত গল্প হলো ফুটবল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এটি আমাদের কমিউনিটির অংশ হয়ে আছে, কিন্তু এই ইতিহাসের বড় একটি অংশ এখনো মানুষের স্মৃতি, পারিবারিক ছবি ও ব্যক্তিগত সংগ্রহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।” তিনি বলেন, “আমরা আনন্দিত যে তারিক বেঙ্গল ইউনাইটেড প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

 

ইতিহাসবিদ, লেখক ও হেরিটেজ পেশাজীবী হিসেবে তার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি এই ইতিহাসকে ভেতর থেকে জানেন। আমরা আশা করি, এই প্রকল্প আমাদের ঐতিহ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশকে প্রাপ্য দৃশ্যমানতা ও স্বীকৃতি দেবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করবে।”

 

প্রকল্পের শেষে একটি জনসম্পৃক্ত উদযাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। সেখানে টাওয়ার হ্যামলেটসে ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জীবনে ফুটবলকে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে ভূমিকা রাখা বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের গল্প প্রথমবারের মতো একসঙ্গে তুলে ধরা হবে।