ইসমাইল হোসেন বাবুঃ

কাগজে-কলমে বিপুল পরিমাণ বালু অপসারণের তথ্য থাকলেও বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। কুষ্টিয়ার গড়াই নদী খনন প্রকল্পের প্রায় ১০ কোটি ঘনমিটার বালুর কোনো হদিস নেই। সরকারি হিসাবে এ বালুর দাম ৩৫০ কোটি টাকা। তবে টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি হলে বালুর দাম হতো দ্বিগুণ।

 

স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রকাশ্যে এসব বালু লুট করেছেন রাজনৈতিক দলের নেতারা। আওয়ামী লীগ আমল থেকে একই স্টাইলে চলছে বালু লুট। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, সব দপ্তরে চিঠি চালাচালি করেও বালু লুট ঠেকানো যায়নি।

 

সূত্রে জানা যায়, চার ধাপে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কুষ্টিয়ার গড়াই নদী খনন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০১৮ সালে সর্বশেষ ধাপে ৫৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে খননকাজ শেষ করা হয়। এ সময় নদীর তলদেশ থেকে ৪ কোটি ১৭ লাখ ঘনমিটার বালু অপসারণ করে ১০টি মৌজায় সংরক্ষণ করা হয়। বিপুল পরিমাণ এ বালুর মধ্যে টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে মাত্র ১৭ লাখ ঘনমিটার বালু। বর্তমানে ছয়টি মৌজায় সংরক্ষিত আছে মাত্র ৬০ লাখ ঘনমিটার। বাকি ৩ কোটি ৪০ লাখ ঘনমিটার বালু কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই।

 

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয়ে গড়াই খননের সর্বশেষ ধাপে ৫৯০ কোটি টাকা ব্যয়ের নথি সংরক্ষিত আছে। সর্বশেষ ধাপের নথি অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ৩ কোটি ৪০ লাখ ঘনমিটার বালু লুটের তথ্য। কিন্তু আগের তিন ধাপে ১ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়াই খননের কোনো তথ্য কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডে সংরক্ষিত নেই। আবার খোদ কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, আগের তিন ধাপের খননের কোনো বালু বিক্রি করা হয়নি। তাহলে এত বালু কোথায় গেল-এমন প্রশ্ন করা হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা রসিকতা করে বলেন, ‘বালু বাতাসে উড়ে গেছে।’ গড়াই নদী খনন প্রকল্পের অপসারণ করা প্রায় সাড়ে তিন লাখ ঘনমিটার বালু ওই দুই মৌজায় সংরক্ষণ করে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড।

 

৫ জানুয়ারি জেলা পানিসম্পদ উন্নয়ন কমিটির সভায় সংরক্ষিত ওই বালু টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রির অনুমতি পায় মেসার্স শান্তা অ্যাসোসিয়েট নামে একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু টেন্ডারের কয়েকদিন পরই শান্তা অ্যাসোসিয়েটের প্রোপ্রাইটর শান্তা ইসলাম পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসককে লিখিত চিঠি দিয়ে জানান, ওই দুই মৌজায় খনন প্রকল্পের কোনো বালুই নেই। স্থানীয়রা বলছেন, এক বছর ধরে প্রতিদিন শত শত ড্রাম ট্রাকে এসব বালু পাচার করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গড়াই নদী খনন প্রকল্পের বালু লুটে এখানে সবাই মিলেমিশে একাকার।

 

প্রশাসনের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগের শাসনামলে শুরু হয় বালু লুটের মহোৎসব। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর সেই একই স্টাইলে চলছে বালু লুট। এখানে আ.লীগ-বিএনপি, এনসিপি-সবাই বালু লুটে তারা এখন ‘এক গোয়ালের গরু’। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, গড়াই নদীর নাব্য ফেরাতে প্রায় ২ হাজার ২২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড। ১৯৯৭ সাল থেকে চার ধাপে কুষ্টিয়ার ৪০ কিলোমিটারজুড়ে গড়াই নদীর তলদেশ থেকে বালু অপসারণ করা হয়।

 

সর্বশেষ ২০১৮ সালে ৫৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে খনন প্রকল্প থেকে প্রায় ৪ কোটি ১৭ লাখ ঘনমিটার বালু অপসারণ করা হয়। সে হিসাবে চার ধাপে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার খননে নদীর তলদেশ থেকে ১৬ কোটি ঘনমিটার বালু অপসারণ করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ এ বালুর মধ্যে ৬ কোটি ২০ লাখ ঘনমিটার বালুর হিসাব মিলেছে। এর মধ্যে খননের ৪০ কিলোমিটারে তীরবর্তী নিচু স্থান ভরাট ও স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহার হয়েছে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ঘনমিটার বালু। অপরদিকে পদ্মা-গড়াই মোহনায় বাংলো নির্মাণ ও বনায়নে ব্যবহার হয়েছে সর্বোচ্চ এক কোটি ঘনমিটার বালু। আর বর্তমানে ছয়টি মৌজায় সংরক্ষণ রয়েছে আনুমানিক ৬০ লাখ ঘনমিটার বালু। এছাড়া টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে ১৭ লাখ ঘনমিটার।

 

বালুখেকো আওয়ামী লীগের কয়েকটি গ্রুপ প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এসব বালু লুট করেছে। নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে এক যুগ ধরে বড় বড় ড্রাম ট্রাকে বালু পাচার করা হয়। সেসময় গড়াই খননের বালু লুটের সংবাদ একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে কৌশল পরিবর্তন করে বালুখেকোরা। এরপর জেলা প্রশাসনের দপ্তর থেকে নদীর বালুমহালের ইজারার কাগজ নিয়ে শুরু হয় প্রকাশ্যে খননের বালু লুট। এক বছরের জন্য ইজারা নিয়ে নদীর বালু উত্তোলনের পাশাপাশি প্রতিদিন শত শত ড্রাম ট্রাকে পাচার হয়েছে খননের বালু।

 

এভাবে একের পর এক বিভিন্ন মৌজায় সংরক্ষিত লাখ লাখ ঘনমিটার বালু চলে যায় বালুখেকোদের পেটে। এ লুটের সঙ্গেও একজোট থেকে কমিশন নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারাও। সময়ের প্রত্যাশা’র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ১৭ লাখ ঘনমিটার বিক্রির অনুমতি নিয়ে প্রায় ১ কোটি ঘনমিটার বালু নিয়ে গেছেন ইজারাদারের নামে রাজনৈতিক দলের নেতারা। এ স্টাইলে সবচেয়ে বেশি লুটপাট হয়েছে তিনটি মৌজার বালু। এর মধ্যে রয়েছে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার জুগিয়া মৌজা এবং কুমারখালী উপজেলার লাহিনীপাড়া ও জয়নাবাদ মৌজা। তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পালটে যায় বালু লুটের স্টাইল। এবার স্থানীয় প্রশাসনের দপ্তর থেকে নদীর তীরে কয়েক মাসের জন্য খাশকালেকননের কাগজ নিয়ে গড়াই খননের বালু লুটে মাঠে নামে এনসিপি ও বিএনপি নেতারা। অন্তত পাঁচটি শক্তিশালী ড্রেজার মেশিনের সাহায্যে দিনে-রাতে শত শত ট্রাকে বালু বিক্রি করেন দুই দলের নেতারা। অল্পদিনে এ চক্রটিও প্রায় ১০ লাখ ঘনমিটার বালু খেয়ে ফেলেছে।

 

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জাহেদুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্প চলাকালীন আমি এখানে ছিলাম না। ২০২৫ সালের জুনে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে গেছে। আমি তারপর এখানে যোগদান করেছি। তখন যারা কর্মরত ছিলেন, তারা বলতে পারবেন ওই প্রকল্পের বালু কখন কোন কাজে ব্যবহার করেছেন।’