রনি রজবঃ
“বন্ধুত্ব কোনো চোখের আলো খোঁজে না, খোঁজে হৃদয়ের টান” এই প্রবাদটিই যেন বাস্তবে রূপ নিয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলায়। আজকের এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজে যেখানে স্বার্থ ছাড়া মানুষে মানুষে সম্পর্ক গড়ে ওঠে না, সেখানে এক অন্ধ যুবকের প্রতি আরেক যুবকের নিখাদ ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের গল্প পুরো এলাকায় সাড়া ফেলেছে। তারা হলেন ভোলাহাটের তেলিপাড়া গ্রামের মিল মালিক মোঃ সিলু এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মুখলেস।
একটা সময় মুখলেসের দিনগুলো কাটতো চরম অনিশ্চয়তা আর জীবনসংগ্রামে। দুচোখে দৃষ্টি না থাকলেও পেটের তাগিদে প্রতিদিন দীর্ঘ দুই কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে আসতেন স্থানীয় একটি কাঠ কাটা মিলে। সেখান থেকে কাঠ সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়ে মাকে দিতেন আর তার মা তা বাজারে বিক্রি করে যা পেতেন তা দিয়েই চলতো বৃদ্ধা মা ও তাঁর সংসার।
কিন্তু অন্ধকার জীবনে আলোর ছটা নিয়ে আসে নিউজটুয়েন্টিফোর। সেখানে মুখলেসের এই অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের প্রতিবেদনটি প্রচারিত হওয়ার পর রাতারাতি বদলে যায় তাঁর ভাগ্য। প্রতিবেদনটি দেখে দেশ-বিদেশের বহু সহৃদয় মানুষ সাহায্যের হাত বাড়ান। এমনকি একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান মুখলেসের আজীবনের ভরণপোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব তুলে নেয়।
সংসারের অভাব দূর হয়েছে, দূর হয়েছে দুমুঠো ভাতের চিন্তা। কিন্তু যে কাঠ মিল থেকে মুখলেসের সুদিনের শুরু, সেই মিলের প্রতি টান একটুও কমেনি তাঁর। এখন আর তিনি সেখানে কাঠ কাটতে বা জীবিকার খোঁজে আসেন না, আসেন তাঁর শৈশবের বন্ধু, মিল মালিক মোঃ সিলুর টানে।
সিলু বলেন,”আমরা সমবয়সী, ছোটবেলা থেকেই ধুলোবালি মেখে একসাথে বড় হয়েছি। মুখলেসের কষ্টের দিন শেষ হয়েছে, কিন্তু আমাদের সম্পর্ক আগের মতোই আছে। প্রতিদিন আমরা একসাথে সময় কাটাই, আড্ডা দিই, একসাথে খাই। তাকে কেউ বাড়িতে আটকে রাখতে পারে না, আমার কাছে সে আসবেই। আমাদের এই বন্ধুত্ব যেন আমৃত্যু অটুট থাকে আপনারা সবাই দোয়া করবেন।”
সিলু তাঁর এই বিশেষ বন্ধুকে কখনো একা বোধ করতে দেন না। ব্যবসার ব্যস্ততার মাঝেও মুখলেসকে সময় দেওয়া, তাঁকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া আর গল্পে মেতে ওঠা সিলুর দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
সাধারণত সমাজে কোনো মানুষ প্রতিবন্ধী হলে অনেকেই তাঁর থেকে দূরত্ব বজায় চলেন। কিন্তু সিলু ও মুখলেসের এই অবিচ্ছেদ্য বন্ধন দেখে অবাক তেলিপাড়া গ্রামের মানুষ।
গ্রামবাসীরা জানান, এমন নিখাদ ও নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব এই যুগে কল্পনাই করা যায় না। সারাদিন তাঁরা ছায়ার মতো একে অপরের পাশে থাকেন। একজন অন্যজনকে না দেখলে অস্থির হয়ে পড়েন। তাঁদের এই মেলবন্ধন পুরো গ্রামের মানুষকে ভালোবাসার এক নতুন শিক্ষা দিচ্ছে।
বইয়ের পাতায় বা সিনেমার পর্দায় আমরা যে কাল্পনিক বন্ধুত্বের গল্প দেখি, সিলু আর মুখলেস যেন ভোলাহাটের তারই এক জীবন্ত উদাহরণ। তাঁদের এই অটুট ভালোবাসা বেঁচে থাকুক আজীবন।