ইসমাইল হােসেন বাবুঃ
লাখো মানুষের স্রোত মিশেছে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়িতে। এমন জনস্রোত গত দুই দশকে কখনো হয়নি বলে মত বাউল-সাধুদের। আখড়াবাড়ি ছাড়িয়ে মানুষ রাত কাটিয়েছে এক কিলোমিটার দূরে গড়াই নদের পাড়ে। রাত যতই বেড়েছে, মানুষের জমায়েত ততই বেড়েছে। আখড়াবাড়ির দুই দিকের সড়কের এক কিলোমিটার আগে থেকে কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে দিচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আর বাউলেরা বলছেন, সাঁইজি সব সময় শান্তির বার্তা দিয়েছেন। এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে/ যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিষ্টান জাতি গোত্র নাহি রবে…। চিরাচরিত নিয়মে পয়লা কার্তিক রাতে ‘অধিবাস’ শুরু করেন বাউলেরা। সাধুসঙ্গের পর রাতে বাউলেরা খিচুড়ি খেয়ে সাঁইজির আরাধনায় মত্ত থাকেন।

কয়েকজন বাউল বলেন, সাঁইজিকে পেতে দুদিনই যথেষ্ট। তাই তো আত্মার সম্মিলন সবকিছু শেষ করে যখন চলে যেতে হয় নিজের ডেরায়, তখনো তৃষ্ণা থেকেই যায়। যেতে চাইলেও বাদ সাধে মন। ভক্ত সাধু, গুরুর সান্নিধ্য লাভের আশায় আবার সবাই মিলিত হবেন সাঁইজির দোল উৎসবে।
বাউলেরা জানান, গুরু-শিষ্যের মধ্যে প্রকৃত প্রেম জাগে। খুঁজে নেন আত্মার মিল। পান শান্তির সুখপাখি। প্রকৃতির প্রেমে সাড়া দিয়ে প্রতিবছর এই তিরোধানে আসেন। এবার কুষ্টিয়ার ওপর দিয়ে ঢাকার একাধিক ট্রেনের যোগাযোগ থাকায় মানুষের ভিড় যেন বিগত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছে। এবার মেলায় বেচাকেনাও হচ্ছে প্রচুর।
মেলায় আকিক পাথর, আজমেরি সুতা, রুদ্রাক্ষ, শীতলগোটা, কইলজা ফল, নীলগিরি, চক্রমতির মালা, তাবিজ আর মাদুলি কেনার ধুম। সঙ্গে বাহারি রকমের জিলাপি খাওয়া চলে। কলাইয়ের রুটির দোকানের ভিড়টা যেন সব সময়ই লেগে আছে।
লালনের গানে মিলন হবে কতদিনে, আমার মনের মানুষেরও সনে/ লালন তোমার আরশীনগর আর কতদূর/মানুষ ছাড়া খ্যাপারে তুই কুল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি/ সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন, সত্য সুপথ না চিনিলে পাবিনে মানুষের দর্শন লালন সাঁইয়ের গানে গানে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ।
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে লালনের মাজারের আশপাশে ও মরা কালী নদীর তীর ধরে বাউলরা ছোট ছোট আস্তানা গেড়ে সাঁইজিকে স্মরণ করছেন তারই লেখা গান গেয়ে। বাউল-ফকিরদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন ভক্তসহ দর্শনার্থীরাও।
তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসবকে ঘিরে যেন মানুষের ঢল নামে লালনের আখড়া বাড়িতে। শহরের সব রাস্তা গিয়ে মেশে আখড়া বাড়িতে। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসবকে ঘিরে সাধু-ভক্তদের পদচারণায় মুখরিত এখন লালনের আখড়া বাড়ি।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বাউল ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মাজার প্রাঙ্গণ ও আঁখড়াবাড়িতে পা রাখার জায়গা নেই। গান ও আলোচনার মধ্য দিয়ে তারা মাতিয়ে রাখছেন সবাইকে। যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে আছেন।
রাজশাহী থেকে আসা আকবর আলী বলেন, “এই প্রথম এসেছি। অনেক লোকের সমাগম হয়েছে। সব ঘুরে-ঘুরে দেখছি, গান শুনছি।
জাতীয় অনুষ্ঠান হওয়ায় এবার আলাদা আবহ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বাউল মোতালেব আলী। তিনি বলেন, এবার জাতীয়ভাবে হচ্ছে সাঁইজির তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান। তাই আগের থেকে যথেষ্ট সাড়া পড়েছে। মাঠের অবস্থা ভাল। নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, “শঙ্কা নেই তেমন। তারপরও, অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবার ফোর্সের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। র্যাব ও পুলিশ আলাদা চেকপোস্ট বসিয়েছে।