ইসমাইল হােসেন বাবুঃ
বাউল সম্রাট লালন শাহের গানের টানে বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মতো হাজার-হাজার মানুষ ছুটে আসছেন ছেঁউড়িয়ার আখড়া বাড়িতে। লালন ফকিরের আখড়া ও সামনের বিশাল মাঠ এখন ভক্ত-অনুসারী, সাধু-বাউল ও দর্শনার্থীদের পদভারে প্রকম্পিত। ছেউড়িয়ার আঁখড়া এখন পরিণত হয়েছে গুরু শিষ্যর মিলন মেলায়। এবার রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের উদ্যোগ নেওয়ায় দর্শনার্থীরা আগেই আশা শুরু করেছে। প্রতিবছরের তুলনায় আরো বেশি মানুষের সমাগম হবে এবার।
আগামী শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় শুরু হচ্ছে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩৫তম তিরোধান স্মরণে তিন দিনের স্মরণোৎসব। এবছরই প্রথম এ আয়োজন হবে রাষ্ট্রীয়ভাবে।
প্রতি বছরের মত এবারও লালন একাডেমী ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয় এই উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। একই সাথে লালন একাডেমির বিশাল কুঠির শিল্প হস্তশিল্প ও নানা ধরনের লোভনীয় খাবারের দোকানগুলোতে পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। আগে প্রতিবছর উৎসব ও মেলা ৫ দিন হলেও এবার হবে ৩ দিন।

একতারা,ঢোল ও বাঁশির সুরে এখন মুখর লালনের সাধনভূমি কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া। দুর-দুরান্ত থেকে আসা বাউলরা তাদের কন্ঠে গেয়ে চলেছেন লালনের রেখে যাওয়া সব আধ্যাত্মিক গান। তাদের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছেন ভক্তরাও।
এবারও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উৎসবে যোগ দিতে এসেছেন অসংখ্য বাউল, ভক্ত, গবেষক ও দর্শনার্থীরা। ভক্তদের ভীড়ে মুখর ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ীতে আপন মনে লালনের গান গেয়ে চলেছেন বাউল ফকিরেরা। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নেয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
স্মরণোৎসব উপলক্ষ্যে ইতিমধ্যে জাকজমকপূর্ণ আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাধু-ভক্তরা ছুটে এসেছেন লালন আখড়াবাড়ি ও মাজার প্রাঙ্গণে।

আগামী শুক্রবার সাধুদের রীতিতে অনুষ্ঠান শুরু হলেও গ্রামীণ মেলা চলবে তিনদিন ধরে। সেই সাথে আলোচনাসভা ও বসবে গভীর রাত অবধি লালনের গানের আসর। মেলা শেষ হবে ১৯ অক্টোবর রোববার।
সরেজমিনে লালন মাজারে ঘুরে দেখা গেছে, তিন দিন ব্যাপী এই আয়োজনকে ঘিরে এরই মধ্যে দেশ-বিদেশ থেকে ভক্ত-সাধুরা লালনের আখড়া বাড়িতে আসতে শুরু করেছেন। চলছে আখড়া বাড়ির সাজ-সজ্জা। মূল মাজারের সামনের কালী নদীর তীরে করা হয়েছে মঞ্চ ও গ্রামীণ মেলার সকল প্রস্তুতি শেষে।
এবারে লালন মুক্ত মঞ্চে আলোচনাসভার পাশাপাশি প্রখ্যাত লালন সংগীত শিল্পী প্রয়াত ফরিদা পারভীনের স্মরণে আলোকচিত্র প্রদর্শন করা হবে।
আয়োজকরা বলছেন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা মনে করেন, দুই হাজার বছর পূর্বে দার্শনিক সক্রেটিসের বিখ্যাত উক্তি ‘নো দাই সেলফ’ এর মতো মর্মকথা যেভাবে মানুষের মনে দাগ কেটেছিল এবং বিশ্ব সভ্যতার ক্রমবিকাশকে প্রভাবিত করেছিল। এতকাল পরে এসে আধ্যাত্মিক চিন্তার দার্শনিক মহামতি লালনের সংগীত ও ধর্ম-দর্শন নিয়ে দেশ-বিদেশে মুক্ত চিন্তক গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
যদিও এর আগে কার্যত বাউল সাধক ফকির লালন শাহের জীবদ্দশা থেকে চলে আসা দোল উৎসব এবং তিরোধান দিবস স্মরণকে ঘিরে লালন শাহের ভক্ত অনুসারীরা একেবারেই নিজস্ব ঘরানার রীতিতে আচার অনুষ্ঠানের মধ্যেই সাঁইজিকে স্মরণ করতে এদিনটির জন্য অপেক্ষা করেন।
সাধু আনু ফকির বলেন, এবার সাঁইজির অনুষ্ঠান রাষ্ট্রীয়ভাবে বেশ বড় আকারে হচ্ছে। এতে আমরা খুশি। লালনের দর্শন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। মানুষের আনন্দের জাইগা এখন কমে এসেছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান বন্ধ থাকায় এবার আগের তুলনায় বেশি লোকসমাগম হবে এবং হচ্ছে।

মামুন সাধু বলেন, সরকারের এমন উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। অনেক দেরীতে হলেও এত বড় আয়োজনের মধ্য দিয়ে লালনের বাণী দেশবাসীর কাছে তুলে ধরা এবং লালনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ায় আমরা আনন্দিত।
লালন ভক্ত-অনুসারীরা তাদের সাইজিকে খুজে পেতে ছুটে এসেছে লালনের আখড়া বাড়ীতে বললেন দিনাজপুর ফুলবাড়ীয়া থেকে আসা সাধু আলতাফ হোসেন। লালন সাঁইজীর নিকট থেকে আল্লাহর রছুলকে চেনা বা জানার জন্যই এখানে এসেছেন সাধুরা। প্রায় ৪২ বছর ধরে লালনের সানিধ্য পাবার জন্যই এই আখড়া বাড়িতে আসেন। এমনটি জানালেন ঢাকা নারায়ন গঞ্জ থেকে আসা সাধু সাফায়েত উল্লা।
দর্শনার্থী জেরিন জানান, প্রতিবছরই আমি এখানে আসি। এবার রাষ্ট্রীয়ভাবে পালনের উদ্যোগ নেওয়ায় দর্শনার্থীরা আগেই আশা শুরু করেছে। প্রতিবছরের তুলনায় আরো বেশি মানুষের সমাগম হবে এবার।
লালন শাহের ১৩৫তম স্মরণোৎসব উদযাপনে তিন দিনের আয়োজনকে ঘিরে লালন একাডেমী, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সকল প্রস্তুুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানান কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমীর সভাপতি আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন। তিনি আরাে জানান,কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে সে জন্য পুরো এলাকা জুড়ে সিসি ক্যামেরাসহ রাখা হয়েছে ওয়াস টাওয়ারের মাধ্যমে বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টুনি গড়ে তোলা হয়েছে।