ইসমাইল হোসেন বাবুঃ
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় তালেবুর রহমান টুকু (৪৭) গত আটদিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে সম্ভব্য সকল জায়গায় খোঁজ করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে সে নিখোঁজ হয়েছেন। বেচ আছে, না সন্ত্রাসীরা মেরে ফেলেছে এমন আশংকায় পিতার খােজ খবর না পেয়ে ছেলে-মেয়েদের বুকফাঁট কান্না যেন থামছে না।
চরম উৎকণ্ঠায় দিন পার করা টুকুর স্ত্রী নাছিমা খাতুন বলেন, আমার স্বামী ভেড়ামারা জুনিয়রদহ ইউনিয়নের রাইটা থেকে বাড়ি ফেরার পথে নিখোঁজ হয়েছে। তাকে অপহরণ করা হয়েছে কিনা সেটাও বুঝতে পারছি না। গত ১৫ই সেপ্টেম্বর রাত সাড ৮ আটটার পর থেকে পরিবারের সাথে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আমরা ১৬ তারিখে থানায় নিখোঁজের একটি জিডি করি। ৮ দিন পার হলেও এখনো কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না। প্রশাসনকে বললেই তারা বলছে, আমরা খোঁজ চালাচ্ছি।
টুকু উপজেলার ধরমপুর ইউনিয়নের পাটুয়াকান্দি গ্রামের মৃত জুরাতন মন্ডলের চতুর্থ ছেলে। বিগত ৬/৭ বছর ধরেই সে যুবলীগ নেতা আব্দুল আজিজের বালুঘাটের ব্যবসা দেখভাল করে। উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য টুকু। সে যুবলীগ নেতা আব্দুল আজিজের বালুঘাটের নাটোরের লালপুরের পদ্মা নদীর বালুঘাটে মোলা ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা এনে যুবলীগ নেতা আব্দুল আজিজকে দিতাে। খােজনিয়ে জানা যায়, আব্দুল আজিজের বালুঘাটের ভাগের টাকা সে প্রতিদিন ২ থেকে ৫ লাখ টাকা একাই বহন করে আব্দুল আজিজের কাছে পৌছায়ে দিলে দিন হাজরি হিসেবে টুকু পেতাে ১হাজার টাকা।
৫ই আগস্টের পর থেকে যুবলীগ নেতা আব্দুল আজিজ গা ঢাকা দিয়ে আছে। এমন কি নিখােজ তালেবুর রহমান টুকু নিজ এলাকা ছেড়ে ভেড়ামারা শহরের গােপনে বাসা ভাড়া করে থাকে। ধরমপুর ইউনিয়নের পাটুয়া কান্দি নিজ গ্রামে বসবাস করতে না পেরে পৌর এলাকা ফারাকপুর এসে আবুল কালাম ডাব্লুর বাসায় ভাড়া থেকে বসবাস শুরু করে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মত তালেবুর রহমান টুকু তার হোন্ডা এইটটি গাড়িতে চেপে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। রাইটা বাঁধ এলাকায় মৃত রবিউল ইসলাম রবির বাড়িতে গাড়ি রেখে সময় মতাে নৌকা যােগে আজিজের বালুঘাটের টাকা আনতে নাটোরের লালপুর চরের মধে যায়। ৩ লক্ষাধিক টাকা নিয়ে টুকু গত ১৫ই সেপ্টেম্বর আর বাড়ি ফেরেনি।
টুকুর স্ত্রী ও মেয়েরা জানান, ১৫ই সেপ্টেম্বর,রাত ৮টা ২৬ মিনিটে টুকু সর্বশেষ তার মহাজনের ভাগ্নে সেলিমের সাথে ফোনে কথা বলেন। পরবর্তীতে রাত ৮:৪৯ মিনিটে আবার টুকু সেলিমকে ফোন দেন। সেলিম হোয়াটসঅ্যাপে ৮:৫৩ মিনিটে ফোন ব্যাক করলে টুকু আর ফোন ধরেননি। পরবর্তীতে সেই রাতেই পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশকে জানানো হয়।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সর্বশেষ কল ট্রেকিং এ তার মোবাইলের লোকেশন পাওয়া যায় নওদা ক্ষেমিরদিয়াড়। পুলিশ রাতেই বেশ কয়েক জায়গায় তার খোঁজ অভিযান পরিচালনা করে। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় নিখোঁজের বিষয়ে একটি জিডিও করা হয়।
টুকুর ছোট জামাই মো: সরোয়ার হোসেন খোকন জানান, নিখোঁজের পূবের ৫ দিন, তার শশুর তার বাসাতেই ছিলেন। ১৫ই সেপ্টেম্বর সোমবার, রাত আটটার দিকেও তার স্ত্রী আলোর (টুকুর তিন নাম্বার মেয়ে) সাথে তার কথা হয়। খোকনের দাবি, বালু মহলের ৫% শেয়ার হোল্ডার ও টুকুর মহাজন যুবলীগ নেতা আব্দুল আজিজের ভাগ্নে সেলিমের সাথে রাত ৮:২৬ মিনিটে শেষ কথা হয়। পরবর্তীতে রাত আটটা ৪৯ মিনিটে টুকু তাকে ফোন দেয়। সেলিম ৮টা ৫৩ মিনিটে সেই ফোন হোয়াটসঅ্যাপে ব্যাক করেন। কিন্তু তখন তিনি আর ফোন ধরেননি।
খোকন আরও বলেন, তার শশুর বিএনপি আওয়ামী লীগ মিলে অন্তত ৪জনের ৩লক্ষাধিক টাকা নিয়ে বাড়ি আসছিলেন। এরপরে তিনি রাইটা অঞ্চল থেকে নিখোজ হােন। তবে তিনি দাবী করেন, বিগত কিছুদিন থেকেই তিনি হুমকিতে ছিলেন। ৮ই সেপ্টেম্বর, সোমবার কোন এক মারফত থেকে এক আওয়ামী লীগ কর্মী তার কাছে বলে, তার শশুরকে ধরিয়ে দিতে পারলে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে। তাছাড়াও ব্যবসায়িকদিক থেকেও হিসাবনিকাশ নিয়েও কিছু সমস্যা তৈরি হয়।
অন্যদিকে নিখোঁজ টুকুর বড় ভাই জারমান মেম্বার বলেন, আমার জানা মতে তার সাথে কারও ব্যক্তিগত বা বালুরঘাট নিয়ে কোন বিরোধ ছিল না। আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না, আমরা আমাদের ছোট ভাইয়ের যেভাবেই হোক খোঁজ চাই। টুকু যেখানে মোটরসাইকেল রেখেছিলেন সেই বাড়িওয়ালা অর্থাৎ মৃত রবিউলের স্ত্রী জরিনা বেগম বলেন, বেশ কয়েকদিন ধরেই তিনি আমার এখানে সকালে মোটরসাইকেল রেখে যেতেন। রাত্রে নিয়ে যেতেন। সেদিনও আমার এখান থেকে মোটরসাইকেল বের করে নিয়ে গিয়েছিলো, আবার কে বা কারা রেখে গেছেন। আমি ঘরের মধ্যে ছিলাম কোন কিছুই দেখিনি।
এ বিষয়ে ভেড়ামারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রব তালুকদার বলেন, তালেবুর রহমান টুকু নামের একব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। বিষয়টি জানার পর থেকে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানে পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে।