ইসমাইল হােসেন বাবুঃ

কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে কুষ্টিয়ায় বাবা মায়ের কবরে বরেণ্য লালনসঙ্গীত শিল্পী ফরিদা পারভীনের দাফনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ফরিদা পারভীনের বাবা-মায়ের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে। ফরিদা পারভীনের শেষ ঠিকানা কুষ্টিয়া। লালন সংগীতের মধ্য দিয়ে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন। পেয়েছিলেন লাখো ভক্ত স্রোতার ভালোবাসা।

 

ফরিদা পারভীনের শৈশব-কৈশোরের অনেকটা সময়ই কেটেছে এই কুষ্টিয়ায়। এছাড়াও লালনের গান করায় শিল্পীর অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে শহরটিতে।

 

স্বাধীনতার পর লালন সাঁইজির গানের সঙ্গে ফরিদার পারভীনের যোগাযোগ, তখন তিনি কুষ্টিয়ায় থাকতেন। সেখানে তাঁদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন মোকছেদ আলী সাঁই। ১৯৭৩ সালে ফরিদা পারভীন তাঁর কাছেই ‘সত্য বল সুপথে চল’ গান শেখার মাধ্যমে লালন সাঁইজির গানের তালিম নেন। মোকছেদ আলী সাঁইয়ের মৃত্যুর পর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছে লালনগীতির তালিম নেন।

 

লালন সাঁইজির গানের বাণী ও সুরকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বদরবারেও তিনি লালন সাঁইয়ের বাণী ও সুরকে প্রচারের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি জাপান, সুইডেন, ডেনমার্ক, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বহু দেশে লালনগীতি পরিবেশন করেছেন।

 

লালনগীতিতে অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। এর বাইরে ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটির জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী (নারী) হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি ২০০৮ সালে জাপানের ফুকুওয়াকা পুরস্কার লাভ করেন। তার মতো কেউ লালন সঙ্গীত পরিবেশন করতে পারেননি। একুশে পদকসহ অসংখ্য পদক পাওয়া গুণী এই শিল্পীকে ‘লালন সম্রাজ্ঞী’ বলা হয়ে থাকে।

 

কুষ্টিয়া পৌর গোরস্তানের খাদেম নূর ইসলাম বলেন, তিনি দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে এ গোরস্তানে খাদেমের দায়িত্বে আছেন। ফরিদা পারভীনের পরিবারের সঙ্গে তাঁর সখ্য ছিল। ফরিদার বাবা দেলোয়ার হোসেন ১৯৯৬ সালে মারা যান। তাঁকে দাফনের জন্য কবর খুঁড়েছিলেন। এরপর তাঁর মা রৌফা বেগম মারা যান। তাঁকেও একই কবরে দাফন করেছিলেন। আজ ফরিদার লাশ আসছে। সব ঠিক থাকলে তাঁকেও একই কবরে শায়িত করা হবে। এ জন্য কবর প্রস্তুত করা হচ্ছে।

 

কুষ্টিয়া তাঁর শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিভরা জায়গা, যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন মা-বাবা, শিল্পীরও চাওয়া তাঁকে যেন মা–বাবার কবরে সমাহিত করা হয়,এমনটাই মত দিয়েছেন নাহিল ও জিহান। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, ফরিদা পারভীনের শেষ ঠিকানা হবে এবং হলাে কুষ্টিয়া।

 

ফরিদা পারভীনের ছেলে এম আই নাহিল জানান, তাঁরা মাকে কুষ্টিয়ায় নিয়ে যেতে চান। ঢাকায় কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা করতে চান না। যত দ্রুত মাকে দাফন করা হবে, ততই মঙ্গল। তবে গাজী আবদুল হাকিমের বক্তব্য ছিল এ রকম, ‘শিল্পী ফরিদা পারভীন রাষ্ট্রের সম্পদ। তাই আমার চাওয়া, তাঁকে যেন সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শহীদ মিনারে নেওয়া হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়। ফরিদা পারভীনের হাতে গড়া গানের স্কুল “অচিন পাখি”তে শেষবারের মতো ঘুরিয়ে নেওয়া হয়।

 

গাজী আবদুল হাকিম ও ফরিদা পারভীনের আগের সংসারের সন্তানদের চাওয়া যখন বিপরীতমুখী, তখন এ নিয়ে অভিভাবক পর্যায়ের কয়েকজন হাসপাতালের ভেতরই আলোচনায় বসেন। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকায় যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা হবে, কিন্তু চিরনিদ্রায় শায়িত হবে কুষ্টিয়ার পৌর কবরস্থানে, যেখানে শিল্পীর বাবা দেলোয়ার হোসাইন ও মা রওফা বেগমকে সমাহিত করা হয়েছে। ছেলে নাহিল বললেন, আমার মায়ের অসিয়ত ছিল, তাঁকে যেন তাঁর বাবা-মায়ের কবরে দাফন করা হয়। এটা তিনি লিখেও দিয়ে গেছেন। ছেলের কথা শুনে একপর্যায়ে মেনে নেন গাজী আবদুল হাকিমও। সন্তানদের চোখে তখন জল, মুখে একধরনের শান্তি,মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের তৃপ্তি। আবদুল হাকিমও যেন সন্তানদের চাওয়া পূরণ করতে পেরে স্বস্তি পেলেন।

 

ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে পৌঁছালে জানাজা শেষে বাদ মাগরিব মা-বাবার কবরে তার দাফন সম্পন্ন করা হতে পারে। শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ফরিদা পারভীন।