ইসমাইল হােসেন বাবুঃ
‘এসো হে অপারের কান্ডারি’ ‘আর কি বসবো এমন সাধুর সাধ বাজারে’ লালন সাঁইজির এই আধ্যত্ম বানীকে প্রতিপাদ্য করে প্রয়াত ফকির রঞ্জনা ওরফে বুড়ি মা’র তিরোধান বার্ষিকী স্মৃতি স্মরণে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার নিভৃত পল্লী পাককোলার আনন্দ ধামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাধুসঙ্গ।
আত্মশুদ্ধি, জ্ঞানযোগ আর গুরুকর্মের মধ্যদিয়ে গত ১৫জুলাই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে দেশের নানা প্রান্ত থেকে সাধু, লালন ভক্ত ও বুড়ি মা’র অনুসারীরা যোগ দিয়েছেন সাধুসঙ্গে।
সাধুসঙ্গ অনুষ্ঠানে ফকির লালন সাঁইজির গীতজ্ঞান সুধা পরিবেশন করেন প্রবীণ সাধু ফকির নহির শাহ্সহ আনন্দ ধামে আসা বাউল-সাধুুগণ। সাধুদের মতে সাধুসঙ্গ মানে সর্ব মানুষের মিলনের একটা ক্ষেত্র। বিশ্ব ব্রম্ভান্ডে বা পৃথিবীতে মানবজাতি যারা আছেন তারা আছেন বিভিন্ন ধর্ম, গোষ্ঠি ও মতবাদ নিয়ে।
কিন্তু সাধুসঙ্গের আসরে সবাইকে একসঙ্গে মেলানো হয় এবং সবার সঙ্গে ভাববিনিময়ের একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়। মানুষ হিসেবে করণীয়টা কি এবং কিভাবে মানুষ হয়ে উঠতে পারি, সেই শিক্ষাটাই সাধুসঙ্গের ভিতর দিয়ে গড়ে উঠে। তাই পথ ও মত নিয়ে লালন সাঁইজিকে জানতে হলে নিজেকে ত্যাগ করতে হবে। আর যিনি ত্যাগ করতে পারেন তিনি হলেন সাধাক। প্রবীণ সাধু ফকির নহির শাহসহ সাধুসঙ্গে আসা সাধুরা এমনটি জানিয়েছেন।
সাঁইজির কৃপায় বুড়ি মা’র তিরোধান বার্ষিকী স্মৃতি স্মরণে সাধুসঙ্গের আয়োজন করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেছেন সাধুসঙ্গের আয়োজক প্রয়াত বুড়ি মা’র স্বামী ফকির শামসুল শাহ। সত্যকে সাগর মনে করেন সাধুরা। আর এ সত্যসাগরে সবার পক্ষে সাতাঁর কাটা সম্ভব নয় বলে প্রয়োজন হয় সাধুসঙ্গের। আবার সাধুদের মতে আত্মসুদ্ধি, আত্মতত্ব রক্ষা ও সাদা মনের মানুষ হতে হলে গুরুভক্তির মাধ্যমে সেটা সম্ভব। আর এজন্য প্রয়োজন সাধুসঙ্গের। তাই সত্যিকারের সাদামনের মানুষ সাধুদের কাছ থেকে দেখে সহজ মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে প্রয়োজন সাধুসঙ্গের। আর যেটা করে গেছেন আমাদের সকলের প্রিয় বুড়ি মা। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই ছিলেন বলে জানিয়েছেন সাধুসঙ্গে উপস্থিত প্রবীন সাধু রওশন ফকির।
আমন্ত্রণ বা অধিবাসের মধ্যদিয়ে গতকাল বিকেলে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। চা-মুড়ি পর্বের পর রাতে পরিবেশিত হয় সাঁইজির বাণী। এতে অংশ নেন প্রবীণ সাধু, লালন ভক্ত ও আমন্ত্রিত বাউল শিল্পীরা। তা চলে গভীররাত পর্যন্ত। আজ বিকেলে পূর্নসেবার মধ্য দিয়ে ২৪ ঘন্টাব্যাপী সাধুসঙ্গ অনুষ্ঠান শেষ হবে। তবে আনন্দ ধামে আসা সাধুরা রয়ে যাবেন আরো কয়েকদিন।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ১৩ জুলাই ফকির রঞ্জনা ওরফে বুড়ি মা’র দেহত্যাগ করেন। তিনি প্রবীণ সাধু ফকির নহির শাহ্র একমাত্র কন্যা ছিলেন এবং ফকির শামসুল শাহ্র সহধর্মিনী ছিলেন। তাঁর নিজহাতে গড়া আনন্দধামে তাকে সমাহিত করা হয়। আর সেখানেই চলছে সাধুসঙ্গের আয়োজন।