মোক্তার হোসেনঃ
রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের সহযোগিতায়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ রাজবাড়ী জেলা কার্যালয়ের আয়োজনে বুধবার (২৯ এপ্রিল) পাংশা উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা শিক্ষকদের অংশগ্রহণে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে ফ্লিপচার্ট ব্যবহার সংক্রান্ত কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পাংশা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পারমিস সুলতানার সভাপতিত্বে কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে পাংশা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রিফাতুল হক বক্তব্য রাখেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজবাড়ী জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিসার মো. আসিফুর রহমান।
মূল প্রবন্ধে রাজবাড়ী জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিসার মো. আসিফুর রহমান বলেন, কর্মশালার মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে নিরাপদ খাদ্যের বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে খাদ্যের বহুমুখী দূষণরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
তিনি ফ্লিপচার্টের মাধ্যমে ক্লাসরুমের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি, খাবার আগে হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয়তা, খাবার ক্রয়ের সময় লক্ষ্যণীয় বিষয়, বাজার করার পদ্ধতি, ফ্রিজে খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি, রেস্তোরায় খাদ্য গ্রহণের সময় লক্ষণীয় বিষয়, স্ট্রিড ফুড বা ফাটপাতের খাবার (ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি ইত্যাদি) গ্রহণের সময় লক্ষণীয় বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
এর পাশাপাশি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে খাদ্যের বিভিন্ন স্তরের ঝুঁকি ও তা সমাধানের উপায়গুলো বিস্তারিতভাবে তিনি তুলে ধরেন। বিশেষ করে দানা জাতীয় খাবারের ক্ষেত্রে চাল রান্নার সময় পানি ফেলে দিয়ে আর্সেনিক দূর করার পদ্ধতি এবং সুগন্ধি চাল ক্রয়ে সতর্কতার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্বারোপ করা হয়।
এছাড়া শাক-সবজি ও ফলমূল থেকে ক্ষতিকর কীটনাশক ও জীবাণু দূর করতে ২% লবণ বা ৫% সিরকা মিশ্রিত কুসুম গরম পানিতে ১৫-৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিটি শিক্ষকদের জানানো হয়।
আলুর ক্ষেত্রে সবুজ দাগযুক্ত অংশ (সোলানিন থাকায়) বর্জন এবং শিল্প বর্জ্য সমৃদ্ধ এলাকায় উৎপাদিত সবজি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রাণিজ আমিষের সুরক্ষায় মাছ পচনরোধে ফরমালিন বা চিংড়িতে জেলির ব্যবহাররোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যে কোন অনিয়মে ১৬১৫৫ নম্বরে অভিযোগ জানানোর বিষয়টি গুরুত্বের সাথে জানানো হয়। মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস ধ্বংস করতে অন্তত ৫ মিনিট উচ্চ তাপমাত্রায় ফুটিয়ে বা রান্না করে খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হয়।
কর্মশালায় শিক্ষকদের আরও জানানো হয় যে, ভারী ধাতুর ঝুঁকি এড়াতে গবাদি পশুর হাড়, গিলা বা কলিজা এড়িয়ে চলা উত্তম। প্রাত্যহিক খাবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ মসলা ও তেলের ভেজাল সনাক্তকরণে ঘরোয়া কিছু পরীক্ষা শিক্ষকদের হাতে-কলমে দেখানো হয়। যেমন- কুসুম গরম পানিতে গুঁড়া মসলা মিশিয়ে কৃত্রিম রঙের উপস্থিতি পরীক্ষা এবং পানিতে ইটের গুঁড়া শনাক্তকরণ পদ্ধতি।
পোড়া তেলের বারবার ব্যবহার এবং ট্রান্স ফ্যাটের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। শিক্ষার্থীদের টিফিনের নিরাপত্তার জন্য রাস্তার খোলা খাবারের ঝুঁকিগুলো বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়। খবরের কাগজে খাবার মোড়ানোর ফলে ছাপা কালির কার্বন থেকে ক্যান্সারের ঝুঁকি, টক জাতীয় খাবার রান্নায় সিলভারের পাতিল ব্যবহারের ফলে স্নায়ুজনিত রোগ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি ফুচকা-চটপটি থেকে টাইফয়েড ও কলেরার জীবাণু সংক্রমণের বিষয়ে শিক্ষকদের সতর্ক করা হয়।
এছাড়া পিঠা তৈরিতে পুরনো খামির বা ময়দা ও ডালে ছত্রাক জন্মানোর কারণে বটুলিনাম টক্সিন তৈরি হওয়া এবং মুড়ি ও গুড় তৈরিতে হাইড্রোজের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করার জন্য কর্মশালায় আলোচনা করা হয়।
প্রধান অতিথি পাংশা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রিফাতুল হক বলেন, একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে নিরাপদ খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ হলো শিক্ষার্থীরা, আর তাদের গড়ে তোলার কারিগর হলেন শিক্ষকবৃন্দ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যদি শিক্ষার্থীরা খাদ্যের মান ও নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন হয়, তবে সমাজ থেকে অনিরাপদ খাদ্যের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে। উপজেলা প্রশাসন সবসময় এ ধরণের জনহিতকর কাজে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে সব ধরণের সহযোগিতা প্রদান করবে। আমরা চাই পাংশা উপজেলার প্রতিটি পরিবার যেন খাদ্যের নিরাপদতা সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং ভেজালমুক্ত খাবার নিশ্চিত করতে পারে।
সভাপতির বক্তব্যে পাংশা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার পারমিস সুলতানা বলেন, শিক্ষকরা সমাজের পথপ্রদর্শক। তাদের মাধ্যমে অতি সহজেই শিক্ষার্থীদের এবং তাদের অভিভাবকদের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এই উদ্যোগটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। আজকের কর্মশালায় ফ্লিপচার্ট ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষকরা যে কৌশলগুলো শিখবেন, তা তারা প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে পৌঁছে দিবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। স্কুল-কলেজের টিফিন যেন স্বাস্থ্যসম্মত হয় এবং শিক্ষার্থীরা যেন বাইরের খোলা ও অস্বাস্থ্যকর খাবার বর্জন করে, সেদিকে আমাদের বিশেষ নজর দিতে হবে। শিক্ষা অফিস এই সচেতনতা কার্যক্রমকে তৃণমুল পর্যায়ে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। শিক্ষকদের কর্মশালার লব্ধজ্ঞান বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একটি খাদ্য- সচেতন প্রজন্ম গড়ে তোলার আহবান জানানো হয়।
কর্মশালায় সকল শিক্ষককে ১টি করে ফ্লিপচার্ট (বড় সাইজ), ১বক্স ফ্লিপকার্ট (ছোট সাইজ), নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক পারিবারিক নির্দেশিকা বই এবং নিরাপদ খাদ্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন লিফলেট, ক্যালেন্ডার ও প্রচার সামগ্রী এবং কুইজ বিজয়ীদের মগ ও লুডু বোর্ড প্রদান করা হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ এ. এস.এম
মুরসিদ। মোবাইল: 01728 311111
ঢাকা অফিসঃ হোল্ডিং-১৩, লাইন-৬, রোড- ১২, ব্লক-বি, মিরপুর-১১, ঢাকা-১২১৬।
ফরিদপুর অফিসঃ মুজিব সড়ক, ফরিদপুর। মোবাইলঃ ০১৭১১ ৯৩৯৪৪৫